
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রভাব ভবিষ্যতে আর থাকবে না—এমন মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এতে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কেও কোনো স্থায়ী জটিলতা তৈরি হবে না।
ভারতের ইংরেজি সাময়িকী দ্য উইক-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শেখ হাসিনা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও দীর্ঘমেয়াদে তিনি আর প্রাসঙ্গিক থাকবেন না। ফলে আঞ্চলিক কূটনীতি কিংবা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে তার উপস্থিতি কোনো বড় বাধা হয়ে উঠবে না বলেও মত দেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করে ক্ষমতা এককভাবে কেন্দ্রীভূত করার কারণেই দেশে গভীর রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে আরও ইতিবাচক ও সহযোগিতামূলক পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব, এবং সেটিই প্রত্যাশিত হওয়া উচিত।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশের জনগণ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। তার মতে, গত প্রায় ১৫ বছর ধরে মানুষ প্রকৃত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার কখনোই স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। এই বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
নির্বাচনকে ঘিরে বড় ধরনের সহিংসতা বা অস্থিরতার আশঙ্কা নেই বলেও মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখছে এবং সরকারের দিক থেকেও ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রচারণার সময় কিছু বিচ্ছিন্ন সমস্যা হলেও তা পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে না।
জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানান, গত ১৫ বছরে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় বিএনপি বাম ও ডান—উভয় ধারার প্রায় ২০ থেকে ২৪টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত ছিল। এসব আন্দোলনের শরিকদের নিয়েই জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের কথা ভাবা হচ্ছে।
মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার এজেন্ডার ভিত্তিতেই ভবিষ্যৎ সরকার পরিচালিত হবে। কেবল আন্দোলনের সহযোগী দলগুলোকেই এই সরকারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
জামায়াতে ইসলামীর বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে জানান, দলটির সঙ্গে বিএনপির কোনো ধরনের সমঝোতা বা চুক্তি নেই এবং ভবিষ্যতের জাতীয় ঐক্য সরকারেও জামায়াতকে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
ছাত্রদের উদ্যোগে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-র সঙ্গে জোট না হওয়ার ব্যাখ্যায় বিএনপি মহাসচিব বলেন, আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি নতুন প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে জয় পাওয়া কঠিন হওয়ায় বিএনপি নিজেদের প্রার্থীদের নিয়েই এগোতে আত্মবিশ্বাসী ছিল।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন, যদিও দলীয়ভাবে অংশ না নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তার মতে, এতে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন তরুণ ভোটারদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে বলেও মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল। তিনি জানান, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ১৮ মাসের মধ্যে অন্তত এক কোটি তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি খাতের উন্নয়ন, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সাংবিধানিক সংস্কার এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতিও দলের এজেন্ডায় রয়েছে।