
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অভিযোগকে সামনে এনে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও ড. খলিলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের দাবিতে শুক্রবার (৬ মার্চ) জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে দলটি।
শুক্রবার সকালে দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক পোস্টে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, জনগণের ভোটের রায় প্রভাবিত করার অভিযোগে ওই দুই সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ দাবি করে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। কর্মসূচি অনুযায়ী, জুমার নামাজের পর রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এতে ঢাকার বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উপস্থিত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পোস্টে আরও বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত রায় পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও ড. খলিলুর রহমানকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করার দাবি জানিয়েছে দলটি।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দুপুরে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে একই অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এবং বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “গতকাল আমরা একটা রাজসাক্ষী পেয়েছি। সেই রাজসাক্ষীর নাম হচ্ছে সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রিজওয়ানা। তিনি সাংবাদিকের সঙ্গে এটা প্রকাশ করেছেন, যারা তার ভাষায়- নারীদের উপযুক্ত অধিকারকে নিশ্চিত করতে পারেনি, তারা বিরোধী দলে থাকলেও আমরা কিন্তু তাদের মূলধারায় বা প্রধান শক্তি হিসেবে আসতে দিইনি। তখনই বোঝা যায়, যে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা এসেছে, সেটাকে উনি নিজেই স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, কী ধরনের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে মূলধারা বা প্রধান দল হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তা জাতির সামনে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর সঙ্গে আর কারা জড়িত ছিল। পুরো সরকার নাকি সরকারের একটি অংশ নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে তা স্পষ্ট করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাহেরের দাবি, নির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে ডিসি, এসপি, ইউএনও, ওসি ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার করে একটি দলকে নির্দিষ্ট সংখ্যায় বিজয়ী করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল কিনা সেটিও তদন্তের মাধ্যমে প্রকাশ করা জরুরি।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রিজওয়ানা হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় এনে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে।
খলিলুর রহমানকে নিয়েও সমালোচনা করেন তাহের। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে জামায়াত অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল। তার দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো বলে উল্লেখ করেছিল এবং নীতিগতভাবে বলা হয়েছিল, তাদের কেউ পরবর্তীতে দলীয় সরকারের মন্ত্রিত্ব নেবেন না। কিন্তু নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন, যা আগের অবস্থানের পরিপন্থী।
তাহের খলিলুর রহমানকে ‘লন্ডন ষড়যন্ত্রের হোতা’ বলেও উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, “সেখান থেকে তিনি সরকারকে মোটিভেট করে এবং ষড়যন্ত্র করে বর্তমানে যারা সরকারে আছেন তাদের সুবিধা দেয়ার জন্য কাজ করেছেন। সেই কাজের পুরস্কার হিসেবেই তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।”
তিনি আরও দাবি করেন, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ আগে খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে তাকে সরকার থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছিলেন। এরপরও তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি। তাহেরের অভিযোগ, তিনি বিএনপির সঙ্গে গোপন সমঝোতায় গেছেন এবং তাদের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন বলেই তাদের আস্থাভাজন হয়ে উঠেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে তাহের আরও অভিযোগ করেন, সরকারের কিছু উপদেষ্টা বিএনপিকে নির্বাচনে জেতানোর জন্য ষড়যন্ত্র করেছেন। তার দাবি, জামায়াত একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চেয়েছিল, কিন্তু সেই সুযোগ দেশবাসীকে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, যারা সুষ্ঠু নির্বাচন নষ্ট করেছে, তারা মীর জাফর।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান, দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আইনজীবী শিশির মনির ও জাহিদুর রহমান।