
কুমিল্লায় পুলিশি প্রহরায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান মিয়া মূলত আইনের হাত থেকে বাঁচতে ‘অসুস্থতার ভান’ করছেন বলে প্রমাণ পেয়েছেন চিকিৎসকেরা। তাঁর শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনার জন্য গঠিত বিশেষ মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাঁকে সম্পূর্ণ সুস্থ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। তদন্তের সাথে যুক্ত একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি মোহাম্মদ শামছুল আলম শাহ স্পষ্ট জানিয়েছেন, জিসান মূলত পুরোপুরি সুস্থ আছেন; কেবল গ্রেফতারের খবর শোনার পর থেকেই তিনি চোখ বন্ধ করে অসুস্থ সেজে পড়ে রয়েছেন। মঙ্গলবার মেডিকেল বোর্ডের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরপরই পুলিশ তাঁকে আদালতে সোপর্দ করবে।
পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লার দাউদকান্দিতে এক নারীকে উপর্যুপরি ধর্ষণ ও গর্ভের ভ্রূণ নষ্ট করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে শিবির নেতা জিসান মিয়াকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তবে নিজেকে ‘অসুস্থ’ দাবি করে তিনি কৌশলে পুলিশি হেফাজতে হাসপাতালে ভর্তি থাকায় এত দিন তাঁকে আদালতে পাঠাতে পারছিল না পুলিশ।
এমতাবস্থায় জিসানের অসুস্থতার সত্যতা নিশ্চিত হতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের মেডিকেল বোর্ড গঠন করে। সোমবার বোর্ডের সদস্যরা নিবিড়ভাবে তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তিনি সুস্থ রয়েছেন মর্মে বোর্ড কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছে।
মেডিকেল বোর্ডের সদস্য সচিব ও হাসপাতালের অ্যানাস্থেসিয়া বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান মজুমদার এই প্রক্রিয়ার বিষয়ে বলেন, "দীর্ঘ সময় নিয়ে জিসানের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এতে তাকে সুস্থ অবস্থায় দেখা গেছে। রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে একটি প্রতিবেদন পরিচালকের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমাদের সরাসরি কোনো মন্তব্য করার সুযোগ নেই। এ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলবেন হাসপাতালের পরিচালক। তবে আমাদের কাছে খালি চোখে যতটুকু দেখা গেছে, রোগীর অবস্থা খারাপ নয়, ভালোই মনে হয়েছে। পরিচালক সাহেব এক দিনের ছুটিতে আছেন। তিনি এলে হয়তো আরেকটু দেখে এবং মেডিসিন বিভাগের প্রধানের সঙ্গে কথা বলে তাকে ছুটি দিতে পারেন।"
কুমেক হাসপাতালের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, চার সদস্যের এই মেডিকেল বোর্ডটি সোমবার দুপুরে পরিচালকের কার্যালয়ে এক জরুরি বৈঠকে বসে। পরবর্তীতে তারা জিসানের কেবিনে গিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা সরজমিনে দেখেন এবং তাঁর সমস্ত প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করেন। দীর্ঘ পর্যালোচনার পর বোর্ড জিসানের শরীরে বড় ধরনের কোনো রোগ বা শারীরিক জটিলতা খুঁজে পায়নি। চিকিৎসকদের কাছে জিসান সম্পূর্ণ সুস্থ বলে প্রতীয়মান হওয়ায় এই মতামতের ভিত্তিতে যেকোনো মুহূর্তে তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র (ডিসচার্জ) দেওয়া হতে পারে।
হাসপাতালের সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে কুমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক নিশাত সুলতানা জানান, "মেডিকেল বোর্ড জিসানের শারীরিক অবস্থার পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষা নিরীক্ষার রিপোর্ট দেখেছে। তারা একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। এতে সব চিকিৎসকের স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়নি। মঙ্গলবার তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হতে পারে।"
একই সুরে কুমিল্লা জেলা ডিবির ওসি মোহাম্মদ শামসুল আলম শাহ বলেন, "শিবির নেতা জিসান মিয়া শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন। গ্রেফতারের কথা শুনে তিনি অসুস্থতার ভান করছেন। মেডিকেল রিপোর্ট হাতে পেলে আমরা তাকে আদালতে সোপর্দ করব।"
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানও আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "চিকিৎসকরা ছাড়পত্র দিলেই আমরা তাকে আদালতে সোপর্দ করব।"
উল্লেখ্য, কুমিল্লার দাউদকান্দিতে এক নারীকে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ ও জোরপূর্বক ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে শিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জিসান প্রধানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী নারী নিজে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই নারীকে বিয়ে করার আইনি দায় এড়াতে জিসান নিজেই নিজের অপহরণের একটি নাটক সাজিয়েছিলেন। এরপর নিখোঁজ থাকার নাটকীয় অবসান ঘটিয়ে চিকিৎসার অজুহাতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে ভর্তি হন; কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই ওই নারীর দায়ের করা মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এর আগে, কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে কথিত নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর শুক্রবার রাতে কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে জংশন এলাকা থেকে ‘অচেতন’ অবস্থায় জিসানকে উদ্ধার করার দাবি জানায় তাঁর পরিবার। সেই রাতেই তাঁকে চিকিৎসার জন্য কুমেক হাসপাতালে আনা হয়। তবে পুলিশের দাবি—জিসানকে কেউ অপহরণ করেনি, তিনি মূলত স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে ছিলেন।
২৮ বছর বয়সী জিসান মিয়া ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদের পাশাপাশি সংগঠনটির কুমিল্লা জেলা পশ্চিম শাখার সাবেক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১১ জুন নিজে নিখোঁজ হয়ে অপহরণের ছক তৈরি করেন জিসান মিয়া। তাঁকে উদ্ধারের পর গত শুক্রবার রাতেই ওই ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে দাউদকান্দি মডেল থানায় জিসানকে প্রধান আসামি করে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কঠোর ধারায় করা এই মামলায় জিসানের বিরুদ্ধে একাধিকবার ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্ট করার ভয়ংকর অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলায় জিসান ছাড়াও গ্রেফতার হওয়া অপর তিন আসামি হলেন— সেকান্দর আলী (২৪), গোলাম রাব্বী (২৬) ও সজীব হাসান (২১)। দাউদকান্দির বাসিন্দা এই তিনজনই জিসানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। গত শনিবার বিকেলেই তাদের কুমিল্লার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।