
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আওয়ামী লীগের নেতা সালিম মাহমুদ ও রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী রাবি আলমকে নিয়ে একটি সেমিনার ও প্রেস কনফারেন্স আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করা হয়েছে। আয়োজকদের দাবি, দিল্লি পুলিশের অনুমতি না পাওয়ায় অনুষ্ঠানটি বাতিল করতে হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, অনুষ্ঠান আয়োজনে তাদের অনুমতির প্রয়োজন ছিল না এবং তারা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপও করেনি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট জানিয়েছে, শনিবার (২৯ আগস্ট) ‘ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া: ফ্রম ডায়ালগ টু আ পার্টনারশিপ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটি আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া (এফসিসি) এবং বেলজিয়ামভিত্তিক হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে সেমিনার কাম প্রেস কনফারেন্সটি হওয়ার কথা ছিল।
অনুষ্ঠানের প্যানেলে ১০ জনের থাকার কথা ছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন চেক রাজনীতিক ওন্দ্রেজ দস্তাল, জার্মান কূটনীতিক পিটার ফারেনহোল্টজ, বাংলাদেশি-আমেরিকান বিজ্ঞানী নুরান নবী, বাংলাদেশি আইনবিদ ও আওয়ামী লীগ নেতা সালিম মাহমুদ, নেপালের শিশু অধিকারকর্মী সুন্দর ঘিমিরে, রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী রাবি আলম, এফসিসি-আইএপিসির চেয়ারম্যান ভেঙ্কট নারায়ণ, সাবেক কূটনীতিক ভীনা সিকরি, ইউনাইটেড ডিপ্লোম্যাটিক কাউন্সিলের সভাপতি আসিফ ইকবাল এবং হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের মহাসচিব গোলাম জিলানি।
এফসিসির এক সদস্য দ্য প্রিন্টকে জানান, নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শুক্রবার সন্ধ্যায় ক্লাবের ব্যবস্থাপনা দলের একজন সদস্য দিল্লির তিলক মার্গ থানায় যান। অনুষ্ঠানের অনুমতি চাওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য পুলিশ মোতায়েনের অনুরোধ করা হয়। এ সময় পুলিশ কর্মকর্তাদের অনুষ্ঠানের বিস্তারিত তথ্যও দেওয়া হয়।
পরে এফসিসিকে জানানো হয়, দিল্লি পুলিশ অনুষ্ঠানটির অনুমতি দিচ্ছে না। এরপর ক্লাবের পক্ষ থেকে সদস্যদের কাছে নোটিশ পাঠিয়ে অনুষ্ঠানটি বাতিলের বিষয়টি জানানো হয়।
নোটিশে বলা হয়, ২৯ আগস্ট সন্ধ্যার নির্ধারিত ‘ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া’ অনুষ্ঠানটি দিল্লি পুলিশের অনুমতি না পাওয়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। আকস্মিক এই পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
এফসিসির সভাপতি ওয়ায়েল আওয়াদ দ্য প্রিন্টকে বলেন, ‘অনুষ্ঠানটির মূল বিষয় ছিল অংশীদারত্ব ও উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা। তার ভাষায়, এটি ছিল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা। তবে দিল্লি পুলিশ কেন অনুষ্ঠানটির অনুমতি দেয়নি, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।’
পুলিশের দাবি, অনুমতির প্রয়োজন নেই
অন্যদিকে অনুষ্ঠানে পুলিশের হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দিল্লি পুলিশের নিউ দিল্লি জেলার ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (ডিসিপি) সচিন শর্মা।
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের প্যানেল আয়োজনের জন্য এফসিসির পুলিশের অনুমতির প্রয়োজন নেই। পুলিশের পক্ষ থেকেও তাদের কোনো অনুষ্ঠানে হস্তক্ষেপ করা হয়নি।’
তবে দ্য প্রিন্টের হাতে আসা একটি নথিতে অনুষ্ঠানের জন্য ‘কোনো অনুমতি’ দেওয়া হচ্ছে না বলে উল্লেখ রয়েছে। তিলক মার্গ থানার সিলযুক্ত ওই নথিতে ‘কিছু বিতর্কের’ কারণে অনুষ্ঠানটি অনুমোদন করা হচ্ছে না বলে জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তার জন্য পুলিশ চেয়েছিল এফসিসি
পুলিশের কাছে পাঠানো এফসিসির চিঠিতে অনুষ্ঠানের সময়সূচি ও আয়োজনের বিস্তারিত তথ্যও উল্লেখ ছিল। চিঠি অনুযায়ী, ২৯ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ক্লাবে সেমিনার কাম প্রেস কনফারেন্সটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে অনুষ্ঠানে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েনের অনুরোধও জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পুলিশ অনুষ্ঠানটির অনুমতি না দেওয়ার কথা জানালে আয়োজকরা তা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন।
এদিকে এফসিসির একটি সূত্র দ্য প্রিন্টকে দাবি করেছে, গত ৫ আগস্ট একই ক্লাবে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর থেকেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ওই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, তিনি ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন।
সূত্রটির দাবি, দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনের সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারের সমালোচনা করা হয়েছিল। এবারের অনুষ্ঠানের প্যানেলে একজন পরিচিত আওয়ামী লীগ নেতা এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে কাজ করা একজন অধিকারকর্মী থাকায় অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে তারা ধারণা করছে।
তবে অনুষ্ঠান বাতিলের সঙ্গে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন, আওয়ামী লীগ নেতা সালিম মাহমুদ কিংবা রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী রাবি আলমের উপস্থিতির কোনো সম্পর্ক রয়েছে—এমন বিষয় দিল্লি পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
ফলে একদিকে পুলিশ অনুষ্ঠানটিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে, অন্যদিকে পুলিশের সিলযুক্ত নথিতে অনুষ্ঠানের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ‘কিছু বিতর্কের’ কারণ দেখিয়ে অনুষ্ঠানটি অনুমোদন না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।