
দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরুর আগেই সংবাদ সম্মেলনে ‘প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে’ বলে মন্তব্য করা এবং সেই বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচারের আইনগত বৈধতা নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার করা রিটের শুনানি শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে আগামী ১১ নভেম্বর সিদ্ধান্ত জানাবেন হাইকোর্ট।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিচারপতি মো. বশির উল্লাহর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ আদেশ দেওয়ার জন্য ওই দিন নির্ধারণ করেন। আদালতে রিটকারীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার মো. ইউসুফ আলী ও অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মূসা।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সংবাদ ব্রিফিংয়ের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র। রিটে অনুসন্ধানাধীন কোনো বিষয়ে গণমাধ্যমের সামনে মানহানিকর বক্তব্য দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করা থেকে দুদককে বিরত রাখার নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
আবেদনে গত ২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দুদকের আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিং দুটিকে বেআইনি ও আইনগত ক্ষমতাবহির্ভূত ঘোষণা করার আবেদন জানানো হয়। একই সঙ্গে অনুসন্ধান চলমান থাকা কোনো বিষয় নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করা থেকে কমিশনকে বিরত রাখার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্য প্রত্যাহারের জন্যও আবেদন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আগের বক্তব্য যতটা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়েছিল, প্রত্যাহারের বিজ্ঞপ্তিও একই গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশের নির্দেশনা চেয়েছেন রিটকারী।
সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের আওতায় দায়ের করা এই রিটে দুদক চেয়ারম্যান, কমিশনের উপপরিচালক (জনসংযোগ কর্মকর্তা) এবং একজন সহকারী পরিচালককে বিবাদী করা হয়েছে।
রিটের বিবরণে বলা হয়েছে, গত ২ সেপ্টেম্বর দুদকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে কমিশনের উপপরিচালক জানান, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও তাঁর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বদলি, নিয়োগ এবং পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এ কারণে অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। তবে দুদক আইনে অনুসন্ধান শুরুর আগেই এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার কোনো আইনি ক্ষমতা কমিশনের নেই বলে আবেদনে দাবি করেছেন আসিফ মাহমুদ।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ওই বক্তব্যের পর ৯ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে দুদক সচিব সেটিকে ‘স্লিপ অব দ্য টাং’ বা মুখ ফসকে বলা কথা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। সংশ্লিষ্ট উপপরিচালকও সাংবাদিকদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা দিয়ে ঘটনাটিকে অনিচ্ছাকৃত ভুল বলে স্বীকার করেন। কিন্তু এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য প্রত্যাহারের কোনো বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি।
এরপর ১০ সেপ্টেম্বর আইনি নোটিশ পাঠানো হলেও সেটি বিবেচনায় না নিয়ে ১৩ সেপ্টেম্বর দুদকের একজন সহকারী পরিচালক নতুন করে সংবাদ ব্রিফিং করেন বলে রিটে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, জেলা প্রশাসকদের পদায়ন, ওয়াসা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র এবং বিদেশে অর্থপাচারসহ নানা বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়।
এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও অসত্য আখ্যা দিয়ে রিটে আসিফ মাহমুদ তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে তাঁর অতিরিক্ত দায়িত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের জারি করা আদেশ অনুযায়ী। অন্যদিকে, ১৫০ জন সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতি কার্যকর হয়েছিল ২০২৬ সালের ১১ মে, অর্থাৎ তাঁর পদত্যাগের প্রায় পাঁচ মাস পর। তাই ওই পদোন্নতির ঘটনায় তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকার সুযোগ নেই বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
রিটে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর পরিকল্পিতভাবে তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে এসব সংবাদ ব্রিফিং করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন আসিফ মাহমুদ। তাঁর মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি তথ্য অবমুক্তকরণ নীতিমালা, ২০১১-এরও পরিপন্থি।