
গোটা গ্রহের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। আর মাত্র এক দিন পরেই পর্দা উঠছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ও মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬’-এর। এবারের আসরটি শুধু ট্রফি জয়ের চিরাচরিত লড়াইয়ের জন্যই নয়, বরং বেশ কিছু নজিরবিহীন ঐতিহাসিক পরিবর্তন ও রোমাঞ্চকর রেকর্ডের কারণে ফুটবল ইতিহাসে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গুরুত্ব বহন করছে। নতুন খেলার নিয়ম, অচেনা সব দেশের আগমন এবং রেকর্ডের ছড়াছড়িতে ভরপুর এই মেগা টুর্নামেন্টকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা এখন তুঙ্গে।
আসন্ন এই ফুটবল মহোৎসবের পর্দা ওঠার আগে এর পাঁচটি অত্যন্ত চমকপ্রদ ও গুরুত্বপূর্ণ খতিয়ান জেনে নেওয়া যাক:
১. দল ও ম্যাচের সংখ্যায় সর্বকালের রেকর্ড
বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এবারই প্রথম সবচেয়ে বড় কলেবরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফুটবল যুদ্ধ। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে যেখানে ৩২টি দেশ শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে নেমেছিল, সেখানে ২০২৬ সালের আসরে অংশ নিচ্ছে রেকর্ডসংখ্যক ৪৮টি দল। নতুন এই নিয়মে পুরো টুর্নামেন্ট ১২টি গ্রুপে বিভক্ত থাকবে এবং প্রতি গ্রুপে ৪টি করে দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। দল বাড়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচের সংখ্যাও আকাশচুম্বী হয়েছে। গত আসরের ৬৪ ম্যাচের পরিবর্তে এবার ফুটবলপ্রেমীরা উপভোগ করতে পারবেন মোট ১০৪টি ম্যাচ। স্বাভাবিকভাবেই টুর্নামেন্টের স্থায়িত্ব বেড়ে হচ্ছে ৩৯ দিন।
২. তিন দেশের যৌথ রাজত্ব
বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এবার তৈরি হয়েছে এক অনন্য নজির। ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথম কোনো একক বা দুটি দেশ নয়, বরং তিনটি দেশ যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের গুরুদায়িত্ব পালন করছে। উত্তর আমেরিকার তিন পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা একযোগে এই বিশাল ফুটবল যজ্ঞের ভেন্যু হিসেবে কাজ করবে।
৩. সবচেয়ে ছোট দেশের রূপকথা
এবারের বিশ্বকাপে খেলার টিকিট কেটে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাও। মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার জনসংখ্যার এই ছোট্ট দেশটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে কম জনসংখ্যার রাষ্ট্র হিসেবে মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করার অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়েছে। আয়তন কিংবা জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের অনেক সাধারণ শহরের চেয়েও ছোট এই দেশটি এবার ফুটবল বিশ্বের বাঘা বাঘা পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে মাঠ কাঁপানোর সুযোগ পাবে। (কুরাসাও-এর বিশ্বকাপ যাত্রার গল্প জানতে এখানে ক্লিক করুন)
৪. ৫২ বছর পর কঙ্গো ও হাইতির প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অপেক্ষার প্রহর গোনার পর অবশেষে বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরছে দুটি চেনা মুখ—ডিআর কঙ্গো ও হাইতি। এই দুটি দেশ সর্বশেষ ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করেছিল। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৫২ বছর। অবশেষে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে তারা তাদের সেই অর্ধশতাব্দীর খরা কাটিয়েছে, যা এবারের আসরের অন্যতম আবেগঘন এক অধ্যায়।
৫. বিশ্বমঞ্চে চার নতুনের অভিষেক
এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপটি হতে যাচ্ছে চারটি দেশের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এবং প্রথম অভিজ্ঞতা। কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান এবং উজবেকিস্তান—এই চারটি দেশ ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল আসরে পা রেখেছে। বছরের পর বছর ধরে ফুটবল নিয়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও কঠোর পরিশ্রমের ফল হিসেবে তারা এই গৌরব অর্জন করেছে। প্রথমবার খেলতে আসা এই দলগুলোর ভেতরের বাড়তি জেদ ও উদ্দীপনা অনেক সময় টুর্নামেন্টের বড় দলগুলোর জন্য চরম বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ কেবল আরেকটি সাধারণ টুর্নামেন্ট নয়; এটি হতে যাচ্ছে নতুন ইতিহাস, নতুন রেকর্ড এবং ফুটবলের নতুন এক রূপকথার মহোৎসব। প্রতিষ্ঠিত ফুটবল পরাশক্তিগুলোর পাশাপাশি এই নতুন ও উদীয়মান দলগুলোর উপস্থিতি এবারের আসরকে বহুগুণ বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয় করে তুলবে। আগামী কয়েক সপ্তাহ বিশ্ববাসী ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক স্মরণীয় আসর উপভোগ করতে যাচ্ছে, এমনটাই প্রত্যাশা ফুটবলবোদ্ধাদের।