
বিশ্বকাপের মাঠে আর্জেন্টিনার সাফল্যের মধ্যেই মাঠের বাইরে নতুন এক বিতর্ক সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) আর্থিক লেনদেন, স্পন্সরশিপ আয় ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই এবং বিচার বিভাগ। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম লা নাসিওন জানিয়েছে, তদন্তে অর্থপাচার, ওয়্যার জালিয়াতি এবং সম্ভাব্য কর ফাঁকির অভিযোগ যাচাই করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ডিসি ও মায়ামির ফেডারেল প্রসিকিউটররা তদন্তে অংশ নিয়েছেন। তারা খতিয়ে দেখছেন, এএফএর আন্তর্জাতিক স্পন্সরশিপ ও বাণিজ্যিক চুক্তি থেকে আসা শত শত মিলিয়ন মার্কিন ডলার কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানান্তর হয়েছে এবং ওই লেনদেনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আইন লঙ্ঘিত হয়েছে কি না।
তদন্তের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্লোরিডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ট্যুরপ্রডএন্টার এলএলসি। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিপণন ও ইভেন্ট ব্যবস্থাপনায় যুক্ত এই প্রতিষ্ঠানটি বিদেশে এএফএর বাণিজ্যিক আয় এবং বিপণনসংক্রান্ত আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করত।
লা নাসিওন গোপন ব্যাংকিং নথির বরাত দিয়ে দাবি করেছে, এএফএর অন্তত ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার একাধিক শেল কোম্পানির মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো দৃশ্যমান ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা কর্মচারী ছিল না।
বর্তমানে তদন্তকারীরা ক্রীড়া ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আর্জেন্টাইন ফুটবলভিত্তিক ব্যবসায়ী গিয়ের্মো তোফোনির সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টার একটি ভার্চুয়াল বৈঠকও হয়েছে। তবে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত কিংবা অস্বীকার—কোনোটিই করেননি।
এ ছাড়া তদন্তের স্বার্থে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সরকারের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করার বিষয়টিও বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। তদন্তকারীদের ধারণা, এএফএর কার্যক্রম সম্পর্কে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এই তদন্তের প্রস্তুতি শুরু হয় গত বছর। ওয়াশিংটন ডিসি ও ফ্লোরিডার অন্তত তিনজন ফেডারেল প্রসিকিউটর তদন্ত পরিচালনা করছেন, যাদের মধ্যে ব্যাংকিং ও আর্থিক অপরাধ বিষয়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
আরও দাবি করা হয়েছে, ট্যুরপ্রডএন্টার এলএলসির মালিক হাভিয়ের ফারোনি এবং তার স্ত্রী এরিকা জিলেট সিটিব্যাংক, সিনোভাস, ব্যাংক অব আমেরিকা, জেপি মরগ্যান ও পিএনসি ব্যাংক—এই পাঁচটি মার্কিন ব্যাংকের মাধ্যমে শত শত মিলিয়ন ডলারের লেনদেন পরিচালনা করেছেন। এসব হিসাব ব্যবহার করে এএফএর অন্তত ২৬ কোটি মার্কিন ডলারের আয় ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে এই অর্থের বড় একটি অংশের লেনদেনের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে এখনো সন্তুষ্ট নন তদন্তকারীরা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অ্যাডিডাস ও ওয়ার্নারের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এএফএর আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে পাওয়া অর্থও ট্যুরপ্রডএন্টার এলএলসির মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, কর পরিশোধের পর আন্তর্জাতিক আয়ের ৩০ শতাংশের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ শতাংশ লজিস্টিক কমিশন পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এসব আর্থিক নথি বিশ্লেষণ করছে এফবিআই ও যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ।
তবে সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। এএফএর দাবি, ট্যুরপ্রডএন্টার এলএলসির সঙ্গে তাদের বৈধ ও কার্যকর চুক্তি রয়েছে, যা আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশের আদালতেই উপস্থাপন করা হয়েছে এবং কোথাও কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়নি।
সংস্থাটির ভাষ্য, তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগ ও বিভিন্ন প্রতিবেদন দেশের ফুটবল প্রশাসনকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ।
বিশ্বকাপ চলাকালে এই তদন্ত নতুন করে আলোচনার জন্ম দিলেও বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেনি এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফলও প্রকাশ করেনি।