
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে ১১ দফা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগদানের পর তিনি ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সংবাদ সম্মেলনে এই পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
নতুন গভর্নরের বক্তব্যে স্পষ্ট—অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্জিত সামষ্টিক স্থিতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে এখন লক্ষ্য থাকবে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অর্থনীতিকে ‘লো লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম’ থেকে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার রূপরেখা তিনি তুলে ধরেছেন।
১১ দফা পরিকল্পনার মূল বিষয়গুলো
স্থিতিশীলতার ভিত্তি:
ম্যাক্রো অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অটুট রাখা—বৈদেশিক লেনদেন, রিজার্ভ, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব সমন্বয়ের ভারসাম্য রক্ষায় সতর্ক থাকার নির্দেশনা।
অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান:
শুধু জিডিপি নয়, শিল্প, এসএমই, কৃষি ও সেবা খাতে সমান সুযোগ সৃষ্টি করে কর্মসংস্থান বাড়ানো হবে।
বন্ধ কারখানা পুনরায় সচল করা:
গত দেড় বছরে বন্ধ শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করতে নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদান করা হবে।
উচ্চ সুদের হার পুনর্বিবেচনা:
বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা উচ্চ সুদের হার পর্যালোচনা করা হবে, তবে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ না পড়ার ভারসাম্য বজায় রাখা হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ:
‘প্রাইস স্ট্যাবিলিটি’ অগ্রাধিকার। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে মুদ্রানীতি প্রয়োগ করা হবে।
সুশাসন নিশ্চিতকরণ:
ব্যাংকিং খাতে গুড গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা রোধে কড়া নজরদারি।
অবজেকটিভভিত্তিক সিদ্ধান্ত:
ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, তথ্য-উপাত্ত ও নীতিমালাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
রুল-বেইজড ব্যাংকিং:
ঋণ বিতরণ, লাইসেন্সিং ও তদারকিতে নিয়মভিত্তিক কাঠামো কঠোরভাবে অনুসরণ।
ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ:
‘ডেলিগেশন অব অথরিটি’ বাড়িয়ে কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, কাজের গতি ত্বরান্বিত।
আন্ত-সংস্থাগত সমন্বয়:
অর্থ মন্ত্রণালয়, রাজস্ব বোর্ড ও পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূর্তি রক্ষা:
প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক আস্থার জন্য স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখা।
বিশ্লেষণ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
নতুন গভর্নরের পরিকল্পনা তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে—স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। বর্তমান অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং মন্থর শিল্প উৎপাদন উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ।
বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবন, ঋণ ও সুদের হার পুনর্বিবেচনা, নিয়মভিত্তিক ব্যাংকিং ও সুশাসন—এসব বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ ও আস্থার সংকট কাটিয়ে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
গভর্নর বৈঠকে বলেন, “উৎপাদন বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ব্যাংকিং খাতে সমন্বয় জোরদার করা হবে। এছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ সুদের হার পর্যালোচনা ও ঋণপ্রবাহের ভারসাম্য রক্ষা করা হবে।”
তিনি আরও জানিয়েছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়মভিত্তিক ও বৈষম্যহীন হবে এবং কর্মকর্তাদের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে কাজের গতি বাড়ানো হবে।
প্রথম দিনেই স্পষ্ট নীতিগত অগ্রাধিকারের বার্তা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে শুধু নিয়ন্ত্রক নয়, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে সক্রিয় নীতিনির্ধারক হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নতুন গভর্নর। এখন দেখার বিষয়—এই ১১ দফা পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপে রূপ পায় এবং অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে নিতে কতটা কার্যকর হয়।