
ভারতের রাজস্থানের জয়পুরে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিয়ে বক্তব্য দেওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে এক ন্যক্কারজনক হামলার শিকার হয়েছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান মুখ অভিজিৎ দিপকে।
সোমবার (১৫ জুন) জয়পুরের ঐতিহাসিক শহীদ স্মারকে পূর্বনির্ধারিত একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নিতে যাওয়ার সময় ভিড়ের মধ্য থেকে তাঁর ওপর চড়াও হয় একদল দুষ্কৃতকারী। সেখানে তাঁকে একাধিকবার চড়-থাপ্পড় মারার পাশাপাশি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
এদিকে জনসমক্ষে দলনেতার ওপর হামলার এই চাঞ্চল্যকর দৃশ্যটি মোবাইল ক্যামেরায় বন্দি হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, সোমবার বিকেল ৩টার দিকে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ওই শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন অভিজিৎ দিপকে। সভাস্থলে পৌঁছানোর পর তিনি যখন বিপুল সংখ্যক সমর্থকদের কাঁধে চড়ে মূল মঞ্চের দিকে এগোচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ভিড়ের ভেতর ওত পেতে থাকা কিছু হামলাকারী আচমকা তাঁর গলার স্কার্ফ ধরে টান দেয়। এরপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি চড় মারা শুরু হয় এবং কাঁধ থেকে নিচে টেনে নামানোর চেষ্টা করা হয়।
হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও ক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ককরোচ জনতা পার্টি। দলটির রাজস্থান রাজ্য মুখপাত্র অভিষেক জৈন বিট্টু স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তোপ দেগে বলেন, "এই হামলা যেভাবে ঘটেছে তা পুলিশ এবং সরকারের ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তোলে। সমাজবিরোধীদের থামানোর পরিবর্তে প্রশাসন পরিস্থিতিকে আরও খারাপ হতে দিয়েছে। রাজস্থান সরকার ও পুলিশের এই আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং এর সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।"
অন্যদিকে দলটির জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা এই ঘটনার পেছনে প্রশাসনিক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিয়ে অভিযোগ করেন, জুন মাসের এই রেকর্ড ভাঙা তীব্র গরমের মধ্যে ইচ্ছে করেই বিকেল ৩টায় সমাবেশের সময় বেঁধে দিয়েছিল প্রশাসন, যাতে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে কর্মসূচিতে অংশ নিতে না পারে।
হামলার শিকার হওয়ার পরপরই সভাস্থলে দেওয়া এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় অভিজিৎ দিপকে বলেন, "বিক্ষোভস্থলে প্রবেশের সময় আমার ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তবে যত ব্যবস্থাপনাই করা হোক না কেন, আমি কারও ওপর হাত তুলব না। কাপুরুষরাই কেবল সহিংসতার পথ বেছে নেয়। আমি কোনোভাবেই চুপ থাকব না।"
পরবর্তীতে নিজের অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, "এগুলো আমাদের ভয় দেখানোর এবং মূল ইস্যু থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেওয়ার কৌশল। আমাদের একমাত্র দাবি, শিক্ষার্থীদের ওপর হওয়া অন্যায় এবং তাদের আত্মহত্যার দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে। তারা আমাদের ওপর যতবারই হাত তুলুক না কেন, আমরা সহিংসতার পথ বেছে নেব না। আমাদের এই আন্দোলন শান্তিপূর্ণ এবং ভালোবাসার সাথেই এটি চলতে থাকবে।"
একই সাথে হামলাকারী ও বিরোধীদের মানসিক দৈন্যতার সমালোচনা করে তিনি ‘গেট ওয়েল সুন’ (দ্রুত আরোগ্য কামনা) বার্তা দেন।
উল্লেখ্য, ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ মূলত একটি প্রথাবিরোধী ব্যঙ্গাত্মক ফ্রন্ট হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। গত মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের পর দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে এই দলটির জন্ম হয়। তারা ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা শব্দটিকে নিপীড়নের বিরুদ্ধে টিকে থাকার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ লাখ অনুসারী তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সিবিএসই ওএসএম (CBSE OSM) জালিয়াতিসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারা দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছে। ইতোমধ্যে ভারতের প্রখ্যাত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক এবং জনপ্রিয় দক্ষিণ ভারতীয় অভিনেতা প্রকাশ রাজ এই অভিনব আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে রাজপথে নেমেছেন।
অভিজিৎ দিপকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান যদি অনতিবিলম্বে পদত্যাগ না করেন, তবে এই আন্দোলন আরও প্রকট আকার ধারণ করবে এবং খুব শীঘ্রই তারা দিল্লির বুকে বিশাল রাজপথ অবরোধের মতো কর্মসূচি দেবেন।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস।