
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যখন কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের নাগরিকত্ব বাতিল করে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্বাসনের পথ তৈরির চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময়ই নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছেন এই সোমালি বংশোদ্ভূত মার্কিন রাজনীতিক। বর্ণবাদ এ মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে টানা পঞ্চমবারের মতো প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী জন নাগেলকে পরাজিত করে নিজের আসন ধরে রেখেছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এই নেত্রী।
৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে ইলহান ওমর পেয়েছেন ২ লাখ ৬২ হাজার ৭০২ ভোট, যা মোট ভোটের ৭৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী জন নাগেল পেয়েছেন ৫৫ হাজার ৭৬৫ ভোট বা ১৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। রাজ্যটির নির্বাচন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে এ তথ্য উঠে এসেছে।
নির্বাচনে এই জয় এমন এক সময়ে এলো, যখন তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের নামে নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে। নির্বাচনের আগে তাঁর ওয়াশিংটন ডিসির বাসভবনে কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের তল্লাশি এবং পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলবের ঘটনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে।
নাগরিকত্ব বাতিল করে নির্বাসনের পরিকল্পনা
ইলহান ওমরের নাগরিকত্ব কেড়ে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে ট্রাম্প প্রশাসন—গত ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং তদন্ত সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওমরের নাগরিকত্ব কীভাবে অর্জিত হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার মতো তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
তদন্তের মূল বিষয় ইলহান ওমরের যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া এবং তাঁর প্রয়াত বাবা নুর ওমর মোহাম্মদের অভিবাসনসংক্রান্ত নথিপত্র। ওমর ১৯৯৫ সালে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কেনিয়ার একটি শরণার্থীশিবির থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। ২০০০ সালে তাঁর বাবা মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন। বাবার নাগরিকত্বের সূত্র ধরেই তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক ইলহান ওমর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হন।
তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, নাগরিকত্ব পাওয়ার সময় ওমর কিংবা তাঁর বাবা বয়সসংক্রান্ত কোনো তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করেছিলেন কি না। বিশেষ করে, ওমরের বয়স ১৮ বছরের কম ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কারণ, সে সময় কার্যকর মার্কিন আইনে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ১৮ বছরের কম বয়সী সন্তান তার বাবা বা মায়ের নাগরিকত্ব অর্জনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পেতে পারত।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্তের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় তদন্তকারীরা ওয়াশিংটন ডিসিতে ওমরের বাসভবনে তল্লাশি চালান। এ সময় তাঁর মুঠোফোন, ব্যক্তিগত কম্পিউটার, নোটবুক ও পাসপোর্টসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র জব্দ করা হয়। পাশাপাশি মিনেসোটায় একটি ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরির সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও তলব করা হয়েছে। তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, এ বিষয়ে এক ডজনের বেশি সমন জারি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওমরের আর্থিক বিবরণী নিয়েও আলাদা করে অনুসন্ধান চলছে। তবে তাঁর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে আগে একটি নির্দলীয় তদন্তে তাঁকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ অস্বীকার, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দাবি
ট্রাম্প প্রশাসনের তদন্ত ও বাসভবনে তল্লাশির ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন ইলহান ওমর। তাঁর বক্তব্য, অভিবাসন আইন প্রয়োগের নামে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের অভিযানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে। তবে তিনি এ ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না।
নাগরিকত্বসংক্রান্ত অভিযোগও অস্বীকার করেছেন এই কংগ্রেস সদস্য। তাঁর মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, নাগরিকত্ব বাতিল করে তাঁকে নির্বাসনের যে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
এ ক্ষেত্রে মার্কিন আইনে নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়াটিও বেশ জটিল। কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব অর্জনের সময় প্রতারণা বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকার আদালতের মাধ্যমে নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট একক সিদ্ধান্তে কারও নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারেন না। এ জন্য বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে ফেডারেল আদালতে মামলা করতে হয় এবং নাগরিকত্ব অবৈধভাবে অর্জিত হয়েছিল—এমন প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয়। নাগরিকত্ব বাতিলের পর নির্বাসনের ক্ষেত্রেও পৃথক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
তদন্তের মধ্যেই নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়
ট্রাম্পের সঙ্গে ইলহান ওমরের বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। ২০১৯ সালে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর থেকেই অভিবাসননীতি, মুসলিমবিদ্বেষ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলনীতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনা করে আসছেন তিনি। সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিককে বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে নিজের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার কথাও বলেছেন ট্রাম্প।
এবারের নির্বাচনের আগে ওমরের বাসভবনে তল্লাশি এবং অভিবাসনসংক্রান্ত তদন্ত তাঁর নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, রিপাবলিকান প্রার্থী জন নাগেল নির্বাচনী প্রচারে সরকারি সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার রোধ, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তবে এসব ইস্যুর মধ্যেও মিনিয়াপোলিস শহরকেন্দ্রিক মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে ওমরের অবস্থান অটুট থাকে। আগস্টে অনুষ্ঠিত ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনেও পাঁচজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন তিনি। এরপর সাধারণ নির্বাচনে ৭৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়ে পঞ্চমবারের মতো কংগ্রেসে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করেন।
২০১৮ সালে প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এই আসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন ইলহান ওমর। এবারের জয় তাঁর কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থান আরও সুসংহত করল। তবে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের অবসান হচ্ছে না। নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন শেষ পর্যন্ত আদালতে মামলা করবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।