
জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাওয়া, কম মজুরি, আবাসনের সংকট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থের ঘাটতির প্রতিবাদে ইউরোপের একাধিক দেশে বিক্ষোভ চলছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে ছড়িয়ে পড়া এসব আন্দোলনে মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপের পাশাপাশি সরকারের ঋণ এবং সেই ঋণের সুদ পরিশোধে বাড়তে থাকা খরচও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সরকারি ঋণের মোট পরিমাণ বিবেচনায় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশের সমান। বাংলাদেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৪০ শতাংশ। বৈশ্বিক ঋণের চিত্র তুলে ধরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় বিভিন্ন দেশের সরকার আর্থিক সংকটের মুখে পড়ছে। ঋণের বিপরীতে সুদ দিতে ক্রমবর্ধমান অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে তাদের। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ বরাদ্দের সক্ষমতা কমে আসছে।
সরকারি ঋণের পরিমাণে এগিয়ে যে পাঁচ দেশ
আইএমএফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারি ঋণের পরিমাণে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই রয়েছে চীন। দেশটির ঋণ ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ। তালিকার তৃতীয় স্থানে থাকা জাপানের সরকারি ঋণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ১৯৯ শতাংশ, যা বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
চতুর্থ অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির জিডিপির তুলনায় ঋণের পরিমাণ ১০২ শতাংশ। পঞ্চম স্থানে থাকা ফ্রান্সের সরকারি ঋণ ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১১৮ শতাংশ।
এদিকে ইতালির সরকারি ঋণ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১৩৮ শতাংশ। জার্মানির ঋণের পরিমাণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার এবং জিডিপির অনুপাতে তা ৬৫ শতাংশ। সরকারি ঋণের মোট পরিমাণের হিসাবে সপ্তম স্থানে রয়েছে ভারত। দেশটির ঋণ ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৮৩ শতাংশ।
দেড় দশকে বাংলাদেশের ঋণ প্রায় পাঁচ গুণ
বিশ্বের দেশগুলোর সরকারি ঋণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট ঋণের পরিমাণ ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। ২০১০ সালে এই পরিমাণ ছিল ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, গত দেড় দশকে দেশের ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ।
তবে উন্নত অর্থনীতির অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো কম। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ হার ৪০ শতাংশ। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ১২৭ শতাংশ, ফ্রান্সের ১১৮ শতাংশ এবং ইতালির ১৩৮ শতাংশ।
আইএমএফের পূর্বাভাস বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি অর্থব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অবস্থায় ফিরিয়ে আনার কাজ দেশটির জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বন্ডের মাধ্যমে কীভাবে ঋণ সংগ্রহ করে সরকার
সরকার সাধারণত বন্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। এসব বন্ড কিনে বিনিয়োগকারীরা সরকারকে অর্থ দেন। এর বিনিময়ে তাঁরা নির্ধারিত হারে সুদ পান এবং বন্ডের মেয়াদ শেষ হলে মূল অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পান। উদাহরণ হিসেবে, ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের মূল অর্থ মেয়াদ শেষে, অর্থাৎ ১০ বছর পর পরিশোধ করার কথা।
বন্ডের ইল্ড বা মুনাফার হার থেকে আর্থিক বাজারে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়। সাধারণত বন্ডের দাম কমে গেলে এর ইল্ড বেড়ে যায়। এর অর্থ হলো, নতুন করে ঋণ নিতে সরকারকে আগের চেয়ে বেশি সুদ দিতে হয়।
সুদের এই বাড়তি ব্যয় সরকারি বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ঋণের সুদ মেটাতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামোসহ জনসেবামূলক বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ফ্রান্সে ঋণের সুদ বাড়ায় উদ্বেগ
ইউরোপের চলমান বিক্ষোভ ও আর্থিক উদ্বেগের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। দেশটির ঋণ সংগ্রহের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারি অর্থব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১০ বছর মেয়াদি ঋণের বিপরীতে ফ্রান্সকে প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। জার্মানির ক্ষেত্রে এই হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। ইতালি ও গ্রিসের তুলনায়ও ফ্রান্সের ঋণের সুদের হার বেশি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোন ঋণসংকটের সময় গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলোকে ৫ শতাংশ বা তার বেশি সুদে ঋণ নিতে হয়েছিল। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে হয়।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাজেট নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পাশাপাশি সরকারের ব্যয় কমানোর উদ্যোগও জনঅসন্তোষ বাড়িয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ।
ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার
সরকার, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সব খাতের ঋণ হিসাব করলে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বে মোট ঋণ বেড়েছে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের শেষে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। বিশ্বের জনসংখ্যা দিয়ে এই অঙ্ক ভাগ করলে প্রত্যেক মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ হাজার ডলার।
আইআইএফের হিসাব বলছে, বৈশ্বিক ঋণ বৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে। এর পাশাপাশি ঋণের সুদ পরিশোধের খরচও ক্রমাগত বাড়ছে। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে।
এই অর্থের পরিমাণ বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে ব্যয় হওয়া ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি। একইভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের তুলনায়ও সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধের ব্যয় বেশি।
সরকারি ঋণের সুদ মেটাতে ব্যয় বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সেবাগুলোতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে সরকারকে কর বাড়াতে অথবা অন্য খাতের ব্যয় কমাতে হতে পারে।
এ ছাড়া সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বৃদ্ধি পেলে বেসরকারি খাতও এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে না। বন্ধকি ঋণ, গাড়ি কেনার ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এভাবে সরকারি ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় এবং আর্থিক সামর্থ্যের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।