
মানুষের প্রকৃত মর্যাদা শুধু সম্পদ, পদ-পদবি কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় ঈমান, আমল, চরিত্র এবং অন্যের প্রতি তার আচরণের মাধ্যমে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন হাদিসে এমন কিছু গুণের কথা বলেছেন, যেসব গুণের অধিকারী মানুষকে ‘সর্বোত্তম’ বা ‘উত্তম’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ব্যক্তি ও সমাজজীবন সুন্দর করতে এসব গুণের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
১. উত্তম চরিত্রের অধিকারী
মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি সুন্দর চরিত্র। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যাদের চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।’ —সহিহ বোখারি: ৬০৩৫
সুন্দর চরিত্র শুধু হাসিমুখে কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সত্যবাদিতা, নম্রতা, ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য, আমানতদারি এবং মানুষের সঙ্গে সদাচরণও উত্তম চরিত্রের অংশ।
২. যে কোরআন শেখে ও শেখায়
পবিত্র কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক মানুষের মর্যাদা বাড়ায়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে কোরআন শেখে এবং শেখায়।’ —সহিহ বোখারি: ৫০২৭
নিজে কোরআন শেখার পাশাপাশি অন্যকে শেখানোর মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান ও নেক আমল ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পায়।
৩. যে মানুষের উপকার করে
ইসলামে মানুষের কল্যাণ ও উপকার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাদিসে এসেছে, ‘মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।’ —আল মুজামুল আওসাত, তাবরানি: ৫৭৮৭
অন্যের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো, বিপদে সহযোগিতা করা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
৪. দীর্ঘ জীবন পেয়ে যে উত্তম আমল করে
দীর্ঘ জীবন তখনই কল্যাণকর, যখন তা সৎকাজ ও আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় হয়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যার আয়ু দীর্ঘ এবং আমল সুন্দর।’ —জামে তিরমিজি: ২৩৩০
তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নেক আমল, তওবা, ইবাদত ও সৎকাজও বাড়ানো উচিত। জীবনের প্রতিটি বছর যেন পরকালের পাথেয় সমৃদ্ধ করার সুযোগ হয়।
৫. যে ঋণ পরিশোধে উত্তম
ইসলামে মানুষের আর্থিক অধিকার রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে উত্তম সে, যে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে উত্তম।’ —সহিহ বোখারি: ২৩৯৩
ঋণ নেওয়ার পর সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তা পরিশোধে গড়িমসি করা উচিত নয়। পাওনাদারের অধিকার যথাযথভাবে আদায় করা এবং ঋণ পরিশোধের সময় সুন্দর আচরণ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
৬. যে পরিবারের কাছে উত্তম
একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্র সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার আচরণে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’ —জামে তিরমিজি: ৩৮৯৫
বাইরের মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করলেও পরিবারের সদস্যদের অবহেলা করা ইসলামের আদর্শ নয়। স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সদাচরণ করা উত্তম মুসলিমের অন্যতম গুণ।
৭. যে আগে সালাম দেয়
সালাম ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আমলগুলোর একটি। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর নিকট মানুষের মধ্যে অধিক নিকটবর্তী সে, যে তাদের আগে সালাম দেয়।’ —সুনানে আবু দাউদ: ৫১৯৭
সালাম মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে। তাই ছোট-বড়, পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গে সালামের প্রচলন করা ইসলামের সুন্দর শিক্ষা।
৮. যে অন্যকে খাবার খাওয়ায় ও সালামের উত্তর দেয়
অন্যকে খাবার খাওয়ানো এবং সালামের প্রচলন মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে উত্তম তারা, যারা খাবার খাওয়ায় এবং সালামের উত্তর দেয়।’ —মুসনাদ আহমদ: ২৩৯২৬
অতিথি, আত্মীয়, প্রতিবেশী কিংবা অভাবী মানুষের সঙ্গে সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার ভাগ করে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল।
৯. যে মানুষের সঙ্গে মিশে তাদের কষ্টে ধৈর্য ধরে
সমাজে বসবাস করতে গেলে মানুষের বিভিন্ন আচরণের মুখোমুখি হতে হয়। অন্যের আচরণে কষ্ট পেলেও ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মুমিন মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে এবং তাদের কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে, সে ওই মুমিনের চেয়ে উত্তম, যে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে না এবং তাদের কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে না।’ —ইবনে মাজাহ: ৪০৩২
অন্যের ভুল ও আচরণে উত্তেজিত না হয়ে ধৈর্য, সহনশীলতা ও উত্তম আচরণ বজায় রাখা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
১০. যে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক সংশোধন করে
মানুষের মধ্যে মতবিরোধ বা বিরোধ সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সেই বিরোধ বাড়িয়ে না দিয়ে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। নবী কারিম (সা.) মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক সংশোধনের কাজকে সদকার চেয়েও উত্তম বলেছেন। —সুনানে আবু দাউদ: ৪৯১৯
তাই মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করে শান্তি প্রতিষ্ঠা, সম্পর্কের উন্নয়ন এবং বিরোধ মীমাংসায় ভূমিকা রাখা প্রত্যেকের দায়িত্ব।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বাহ্যিক পরিচয় বা সম্পদের মধ্যে নয়; বরং তার চরিত্র, আমল, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও কল্যাণকামী আচরণে প্রকাশ পায়। তাই হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) যেসব গুণের অধিকারীদের উত্তম বলেছেন, সেসব গুণ নিজেদের জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করা উচিত।