
নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা বাজেট বক্তৃতায় দেওয়া হলেও এবং এ খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ রাখা হলেও এখনো প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় উৎকণ্ঠায় রয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট চলতি আগস্টেই প্রকাশ হবে, নাকি আরও বিলম্ব হবে—এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের নীতিগত অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে এটি কীভাবে কার্যকর করা হবে, কত ধাপে বাস্তবায়ন হবে এবং জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ কতটা অনুসরণ করা হবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। মূলত এসব বিষয়েই সমাধানে পৌঁছাতে না পারায় গেজেট প্রকাশ বিলম্বিত হচ্ছে।
শুরুতে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য তিন ধাপের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কমিশনের প্রস্তাবিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর করার কথা ছিল। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জুলাই বাকি ৫০ শতাংশ মূল বেতন কার্যকর করার পরিকল্পনা ছিল। আর তৃতীয় ধাপে ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা চালুর কথা উল্লেখ করা হয়।
তবে পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, কয়েক বছরের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কারণে অনেক সরকারি কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কমিশনের প্রস্তাবিত মূল বেতনের অর্ধেক কার্যকর করলে প্রকৃত বেতন বৃদ্ধি খুবই সীমিত হবে। এতে বেতন কাঠামোয় অসামঞ্জস্যও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
এই পরিস্থিতিতে তিন ধাপের পরিবর্তে দুই ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়েও আলোচনা শুরু হয়। তবে সর্বশেষ সচিব কমিটির বৈঠকে আবার তিন ধাপের পরিকল্পনাই গুরুত্ব পেয়েছে। সেখানে প্রথম ধাপে কেবল মূল বেতন এবং পরবর্তী ধাপে ভাতা কার্যকরের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
আইএমএফের অবস্থান
গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের অর্থের উৎস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলেও আইএমএফ এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানায়নি।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী জানান, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক নেই এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়াতেই এ কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
বড় বরাদ্দের পরও কেন অনিশ্চয়তা?
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি জনপ্রশাসন খাতের জন্য মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে, যার বড় একটি অংশ থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাজেটে অর্থ বরাদ্দ থাকলেও সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকার বেশি হওয়ায় রাজস্ব আদায় বা ঋণ প্রাপ্তিতে ঘাটতি দেখা দিলে সরকার ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করতে পারে।
বেতন কমিশনের সুপারিশে পরিবর্তনের চিন্তা
২০২৫ সালে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের পাশাপাশি ২০টি গ্রেড বহাল রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল।
তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি এবং বাজেট ঘাটতির বিষয় বিবেচনায় সরকার কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়নের পরিবর্তে কিছু ক্ষেত্রে কাটছাঁট বা পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
আগস্টে গেজেট, নাকি আরও অপেক্ষা?
নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন কবে জারি হবে, তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন আলোচনা চলছে। একটি সূত্রের দাবি, চলতি আগস্টেই গেজেট প্রকাশ হতে পারে। অন্যদিকে আরেকটি সূত্রের মতে, প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অক্টোবরের আগে গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা কম।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রজ্ঞাপন জারিতে বিলম্ব হলেও নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর বলে গণ্য হবে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকেই। ফলে গেজেট প্রকাশের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কার্যকারিতার তারিখ থেকে প্রাপ্য বকেয়া আর্থিক সুবিধা পাবেন।
প্রযুক্তিগত জটিলতাও বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থানের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট এবং পেনশন ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) এবং আইবাস প্লাস (iBAS++) সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ধাপে ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করতে হলে পুরো সফটওয়্যার কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন অতিরিক্ত সময় ও কারিগরি প্রস্তুতি।
এদিকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে বিদ্যমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।