
সরকার পরিচালনার পাশাপাশি সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনতে নতুন করে দল গোছানোর উদ্যোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সংগঠনকে পুনর্গঠন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি হালনাগাদ এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখাকে গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি।
দলীয় সূত্র বলছে, আগামী কয়েক মাসে ধাপে ধাপে জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে। একই সঙ্গে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর পর জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক জেলা ও মহানগর কমিটির মধ্যে ৭২টির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বলে দল-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যেও সংগঠনকে সক্রিয় ও কার্যকর রাখতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাসের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের জন্য সংগঠন গোছানো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সরকার পরিচালনাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন বঞ্চনার মধ্যে থাকা মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সরকার পরিচালনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি সাংগঠনিক কাঠামোকেও আরও সুসংহত করার কাজ চলছে।
তিনি বলেন, তৃণমূলে বিএনপির সমর্থকেরা দলের রাজনীতির প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ। স্থানীয় নেতৃত্ব নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ করে ডেলিগেট তালিকা সম্পন্ন হওয়ার পর জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে নজর তৃণমূলে
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে বিএনপি। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্থানীয়ভাবে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি তৈরি না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক ভূমিকা ও গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে দলের সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখতে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিরোধ মীমাংসা করে তৃণমূলের নেতৃত্বকে সক্রিয় করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রেও নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাস
দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। গত ১৫ আগস্ট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, আমান উল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম ডোনার ও মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে সাংগঠনিক গতিশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই তাঁদের অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে।
বিএনপির ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটিতে মৃত্যু, পদত্যাগসহ বিভিন্ন কারণে কয়েকটি পদ শূন্য হওয়ার পর ধাপে ধাপে নতুন সদস্য যুক্ত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এই পুনর্বিন্যাসের পর পর্যায়ক্রমে জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানা পর্যায়েও নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে শূন্য হয়ে যাওয়া পদগুলোতে পদোন্নতি, দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনার বিষয়েও আলোচনা চলছে। দীর্ঘদিন সাংগঠনিক কার্যক্রমের বাইরে থাকা বা বহিষ্কৃত নেতাদের আবেদনও যাচাই করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
মন্ত্রী-এমপিদের বাইরে তৃণমূলে নতুন নেতৃত্ব
দল পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে মন্ত্রী-এমপিদের পাশাপাশি তরুণ ও নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। দলের সাংগঠনিক কাঠামোকে সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো থেকে কিছুটা পৃথক রাখতে জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তাভাবনা চলছে।
দলীয় সূত্রের মতে, মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বের একটি বড় অংশ বর্তমানে সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে থাকায় তৃণমূলে সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখতে বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তরুণ, দক্ষ ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় নেতাদের মূল্যায়নের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
একই সঙ্গে অতীত রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতাকর্মীদের ভূমিকা, সাংগঠনিক সক্ষমতা ও স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতাকেও নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি
বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে নতুন কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়নি। এবার জেলা ও মহানগরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠন, ডেলিগেট তালিকা প্রস্তুত এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের শূন্য পদ পূরণের পর জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমেও সাংগঠনিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকও অনুষ্ঠিত হচ্ছে; ১২ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের তথ্য দলটির পক্ষ থেকেও প্রকাশ করা হয়েছে।
দলীয় নেতাদের ভাষ্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জাতীয় কাউন্সিল—দুই প্রক্রিয়াকে সামনে রেখেই এখন সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত কমিটি পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে তৃণমূলকে সক্রিয় করার পর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের দিকে এগোতে চায় বিএনপি।