-6abcfb49903cb.webp)
বাংলাদেশে ভয়ংকর মাদক হিসেবে পরিচিত ইয়াবার বিস্তার শুরু হয় ২০০২ সালে। এরপর সময়ের সঙ্গে দেশে এই মাদকের ব্যবহার ও চোরাচালান বাড়তে থাকে। মিয়ানমারে উৎপাদিত ইয়াবা বিভিন্ন পথে চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর বিস্তার ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে আসছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
রাজশাহীতেও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চলছে। এসব অভিযানের প্রভাবে নগরীতে আসল ইয়াবার সরবরাহ কমে যাওয়ার সুযোগ নিয়েছে একটি অসাধু চক্র। অভিযোগ উঠেছে, মাত্র এক টাকা দামের সাধারণ ওষুধকে মার্কার বা সাইনপেন দিয়ে লাল-গোলাপি রঙ করে ইয়াবার বিকল্প হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে। প্রতিটি ট্যাবলেট বিক্রি করা হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়।
সংকটকে পুঁজি করে ভুয়া ইয়াবার কারবার
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর আইডি বাগানপাড়া রেললাইন এলাকা, বারো রাস্তা, বুধপাড়া, কোর্ট ঢালান, গুড়িপাড়া ও নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে কৌশলে এসব নকল ট্যাবলেট বিক্রি করা হচ্ছে।
ইয়াবার আদল দিতে চক্রটি মূলত জন্মনিয়ন্ত্রণের ওষুধ ‘মায়াবড়ি’ এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধ ‘ডুরালাক্স’ ব্যবহার করছে। এসব ট্যাবলেটের গায়ে লাল বা গোলাপি রং করে ইয়াবার মতো চেহারা দেওয়ার পর তা মাদক হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে।
বিশেষ করে মাদকের সংকটের সময়ে কম দামে ইয়াবা পাওয়ার আশায় থাকা তরুণরাই এই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন বলে জানা গেছে। এসব ভুয়া ট্যাবলেট সেবনের পর অনেকেই বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যায় পড়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মাদকসেবী জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘন ঘন অভিযানের কারণে অনেক মাদক ব্যবসায়ী ইয়াবা বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তারা বারবার প্রতারিত হচ্ছেন। ইয়াবার বদলে তাদের জন্মনিয়ন্ত্রণের পিল ও ডুরালাক্স দেওয়া হচ্ছে। এসব ট্যাবলেট খাওয়ার পর তাদের ঘন ঘন টয়লেটে যেতে হচ্ছে।
চিকিৎসকের সতর্কতা, হতে পারে গুরুতর শারীরিক জটিলতা
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এবং প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের ওষুধ সেবন স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া।
তিনি বলেন, অপ্রয়োজনে এসব ওষুধ গ্রহণ করলে শরীরে তীব্র পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা কমে যেতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার আশঙ্কা থাকে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো পুরুষ নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণের এ ধরনের ওষুধ সেবন করলে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি স্তন ফুলে যাওয়া, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক এবং পুরুষত্বহীনতার মতো সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
আসল মাদকের সংকটেই নতুন প্রতারণার বিস্তার
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের কারণে যখন আসল মাদকের সরবরাহ কমে যায়, তখন অসাধু চক্রগুলো বিকল্প উপায়ে মাদকসেবীদের ঠকানোর কৌশল নেয়। ওষুধকে ইয়াবার আদলে বিক্রি করাও সেই অপকৌশলের অংশ।
তাদের মতে, এ ধরনের অপরাধ শুধু মাদকসেবীদের প্রতারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর মাধ্যমে নতুন নতুন অপরাধের ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব সমাজের ওপর পড়ে এবং সামাজিক অবক্ষয় আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ কর্মমুখী চিন্তা থেকে সরে গিয়ে সহজ ও অসাধু পথে অর্থ উপার্জনের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র উপ-কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, ইয়াবার পাশাপাশি সব ধরনের মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে মহানগর পুলিশ মাদক বিক্রির বিভিন্ন আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং এসব স্থান থেকে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে ‘মায়াবড়ি’ ও ‘ডুরালাক্স’ রঙ করে ইয়াবার আদলে বিক্রির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলে জানান। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে দেখা হবে বলেও জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।