
সাইবার স্পেস ও ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অবৈধ উপায়ে মাদকদ্রব্য কেনাবেচা, বিজ্ঞাপন কিংবা সরবরাহের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া নতুন একটি আইন নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১৩ই জুলাই জাতীয় সংসদে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল ২০২৬’ পাস হয়। তবে নতুন এই সংশোধনীতে ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত মাদক অপরাধের বিচারের জন্য অভিযুক্তের কাছ থেকে সরাসরি কোনো মাদকদ্রব্য উদ্ধার হওয়া বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি। কেবল অনলাইন চ্যাটিং, ইলেকট্রনিক যোগাযোগ কিংবা ইন্টারনেটভিত্তিক লেনদেনের অকাট্য ডিজিটাল প্রমাণ থাকলেই সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা নিয়ে আইনি মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
‘কোনো মাদক উদ্ধার লাগবে না, খালি ডিজিটাল প্রমাণ’
আইনটির আইনি দুর্বলতা ও অপপ্রয়োগের আশঙ্কা প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফেরদৌস হোসেন তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন:
‘ধরুন, একজন আপনাকে জিজ্ঞেস করলো - 'জিনিস আছে?' আপনি লিখলেন — 'দেখি, জানাই'। এই একটা চ্যাট। একটা স্ক্রিনশট। এইটুকুই যথেষ্ট হতে পারে। কোনো মাদক উদ্ধার লাগবে না। খালি ডিজিটাল প্রমাণ। আর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’
আইনটির কঠোরতার অপব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি তাঁর ভেরিফায়েড পাতায় আরও যোগ করেন:
‘নতুন আইনে মাদক সরবরাহে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হইছে। হ্যাঁ, এই মৃত্যুদণ্ডের অপব্যবহার হবে। কিছু মানুষ হুদাই ঝুলে যাবে। পুলিশ ব্যবসা করবে।’
একই সুর শোনা গেছে ঢাকার আদালতে মাদক মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আইনজীবী মো. নাজমুল হাসানের কণ্ঠেও। ডিজিটাল প্রমাণকে ভিত্তি করে নিরীহ মানুষকে ফাঁসানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন:
‘মাদক মামলার বিচারে আমরা দেখছি যে মাদক সঙ্গে পাওয়া গেলেও যথাযথ ল্যাব বা টেস্টিং সক্ষমতা না থাকা অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা খালাস পেয়ে যায়। এখন আবার সাইবার স্পেসের বিষয়গুলোকে এমনভাবে রাখা হয়েছে যেখানে মাদক উদ্ধারের কোনো বিষয় নেই। ফলে আইনটি অপব্যবহার করে নিরীহ মানুষকেও পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর সুযোগ বাড়বে।’
কেন এই কঠোরতা? কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা
আইনটিতে এমন নজিরবিহীন কড়াকড়ি যুক্ত করার যৌক্তিকতা তুলে ধরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হাসান মারুফ বলেন:
‘দেশে সাইবার স্পেস ব্যবহার করে মাদকের বিস্তারের প্রবণতা বাড়ছে বলেই এ ধরনের আইন প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।’
করোনা মহামারীর পর থেকে অনলাইনে মাদক চালানের এই নতুন প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন:
‘ইয়াবা, ফেনসিডিল, আইস, এলএসডি, কোকেন- এগুলো অনলাইনে ট্র্যাক করে উদ্ধার করেছি। সাইবার স্পেস ব্যবহার করে যে ধরনের ড্রাগই বেচাকেনা করা হোক সেটা ধরার জন্যই কাজ করব। এতদিন আইনে তা ছিল না। অনলাইনে করোনার মহামারীর সময় অনলাইনে মাদক বেচাকেনা শুরু হয়েছে এবং সেটা বাড়ছে। সে কারণেই সাইবার নজরদারির মাধ্যমে মাদক ট্রেস করার চেষ্টা করছি। সাইবার নজরদারি সবসময় বজায় রাখব যাতে মাদকের বিস্তার না ঘটে।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের অবস্থান ও সতর্কবার্তা
তবে এই আইনটির মূল ভাবনার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। মাদক নিয়ন্ত্রণে সাইবার নজরদারিকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন:
‘মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যে আইন করা হয়েছে তা যৌক্তিক, কারণ সাইবার স্পেসে মাদক সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ বা লেনদেনের প্রমাণ পেলে তো ধরতেই হবে।’
তবে এ ধরনের স্পর্শকাতর আইনের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে যেন কোনো অবিচার না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের সতর্ক থাকা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। মনজিল মোরসেদ সতর্ক করে বলেন:
‘তবে উদ্বেগ তৈরির কারণ হলো এদেশে সব আইনই অপব্যবহার হয়। এখানেও সুযোগ আছে। ফলে আইনটি যারা প্রয়োগ করবেন, তাদের উচিত হবে সতর্ক থাকা যাতে করে কোনোভাবেই অপপ্রয়োগের অভিযোগ না ওঠে। অপপ্রয়োগ হলেই জনমনে প্রশ্ন উঠবে এবং তাতে মাদক বিরোধী অভিযান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
আইনে নতুন কী আছে?
মূলত ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮’-এর কাঠামোর ওপর ব্যাপক পরিবর্তন এনে এই নতুন ২০২৬ সালের সংশোধনী বিলটি পাস করা হয়েছে। পাসের দিন উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে জানানো হয়, সাধারণ আদালতের বিচারিক ক্ষমতা ঠিক রেখেই মাদকপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে বিশেষায়িত ‘মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা হবে। এছাড়া সীমান্ত সুরক্ষায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে নিজস্ব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রাধিকার ও বিশেষ ডগ স্কোয়াড গঠনের আইনি সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
নতুন আইন অনুযায়ী—কোনো ব্যক্তি যদি প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপস, ই-ওয়ালেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি (ভার্চুয়াল অ্যাসেট) বা অন্য যেকোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কোনো প্রকার মাদকদ্রব্য কেনা, বেচা, সরবরাহ, বিজ্ঞাপন বা চোরাচালানে লিপ্ত হন, তবে তা কঠোর দণ্ডনীয় অপরাধ। সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসস-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের এসব অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত হলে যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ডসহ সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আর এই অপরাধ যদি কোনো আন্তর্জাতিক বা সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে ঘটে, তবে জরিমানা ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। পাশাপাশি আদালত বা ট্রাইব্যুনাল অপরাধে ব্যবহৃত ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিতে পারবে।
লাইসেন্সধারী মদ ও মাদকের শ্রেণিবিভাগ
মদ পানের ক্ষেত্রে এই আইন সবার জন্য সমান প্রযোজ্য কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অধিদপ্তরের ডিজি মারুফ হাসান স্পষ্ট করেন যে, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক অমুসলিম নাগরিক ও চিকিৎসকের পরামর্শে যাদের বৈধ পারমিট বা লাইসেন্স রয়েছে, তারা নিয়ম মেনে মদ গ্রহণ করতে পারবেন। তবে লাইসেন্স ছাড়া গণহারে কেনাবেচা হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
উল্লেখ্য, প্রচলিত মাদকগুলোকে আইনে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
‘ক’ শ্রেণি: হেরোইন, কোকেন, কোকো উদ্ভূত মাদক, মরফিন, আফিম, ফেনটানাইল, পপি গাছ ও ফলসহ তীব্র মনোদৈহিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী উপাদান।
‘খ’ শ্রেণি: গাঁজা, ভাঙ, সিদ্ধি এবং ০.২ শতাংশের বেশি অ্যালকোহলযুক্ত ওয়াইন, বিয়ার বা চোলাইমদ।
‘গ’ শ্রেণি: মিথানল, স্পিরিট, তাড়ী, পঁচুই ইত্যাদি রাসায়নিক তরল।
প্রসঙ্গত, বিলটি গত ১৩ই জুলাই সংসদে পাস হলেও এটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হওয়ার দিন থেকে কার্যকর হবে, যা বুধবার পর্যন্ত গেজেট আকারে প্রকাশ পায়নি।