
স্কুলে হিজাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে মতবিরোধের জেরে তুরস্ক ও আজারবাইজানের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক, ভাষাগত ও রাজনৈতিক বন্ধন থাকলেও সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সেই সম্পর্কে প্রকাশ্য টানাপোড়েনের চিত্র ফুটে উঠেছে।
‘এক জাতি, দুই রাষ্ট্র’—এই স্লোগান দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরে। তবে শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে সংযত অবস্থান বজায় রাখলেও দুই দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে মতবিরোধ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
হিজাব নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বৈরিতা
সোমবার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের প্রধান উপদেষ্টা ওকতাই সারাল আজারবাইজানের স্কুলের পোশাকসংক্রান্ত বিধি পরিবর্তনের উদ্যোগের সমালোচনা করেন। ওই বিধিতে নির্ধারিত স্কুল ইউনিফর্ম এবং শিক্ষার ধর্মনিরপেক্ষ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পোশাক নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সারাল এই পদক্ষেপকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, হিজাব কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়; বরং এটি ধর্মীয় বিশ্বাসের অপরিহার্য অংশ। মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার কারণে শিক্ষার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে দ্রুত এই সিদ্ধান্ত সংশোধনের জন্য আজারবাইজানের প্রতি আহ্বান জানান।
এর পরদিন আজারবাইজানের ক্ষমতাসীন নিউ আজারবাইজান পার্টি (ওয়াইএপি) কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানায়। দলটি সারাল এবং তুরস্কের ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একেপি) কয়েকজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যকে ‘জনপ্রিয়তাবাদী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে নিন্দা করে।
দলটির বিবৃতিতে বলা হয়, আজারবাইজানকে ঘিরে অপতথ্য ছড়ানোর প্রচেষ্টা ক্রমেই আরও আক্রমণাত্মক, পরিকল্পিত ও প্রকাশ্য মানহানিকর হয়ে উঠছে।
এই বিরোধের মধ্য দিয়ে আজারবাইজানের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় অবস্থান এবং তুরস্কের বর্তমান নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যও সামনে এসেছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েন
দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তির পেছনে আজারবাইজান ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২০ সালে আর্মেনিয়ার সঙ্গে কারাবাখ যুদ্ধের সময় আজারবাইজানকে ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র সরবরাহ করেছিল ইসরায়েল। এরপর দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত বৈরী। এরদোয়ান গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা বলে অভিযুক্ত করেছেন। একই সময়ে তুরস্কের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের নেতাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়।
তুরস্কের সরকারঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলোও আজারবাইজানের হিজাবসংক্রান্ত বিধির সমালোচনা করেছে। দেশটির দৈনিক ইয়েনি শাফাক এই বিধিকে ইসরায়েলের প্রতি একটি ইঙ্গিত হিসেবে বর্ণনা করেছে।
অন্যদিকে, আজারবাইজানের ক্ষমতাসীন দল বলেছে, দেশটির সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিকৃত করা এবং সেটিকে আজারবাইজানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগ তোলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা তারা প্রত্যাখ্যান করে।
আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আজারবাইজানের আত্মবিশ্বাস
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বিরোধ আজারবাইজানের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের আকাঙ্ক্ষারও প্রতিফলন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার মধ্যে তুরস্ক যখন কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন বাকুও নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান আরও দৃঢ় করতে চাইছে।
স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফুয়াদ শাহবাজভের মতে, বৃহত্তর ইউরেশিয়ার পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আজারবাইজানকে আরও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সুযোগ দিয়েছে। এর ফলে দেশটি এখন বাইরের শক্তিগুলোর পাশাপাশি নিজের মিত্র তুরস্কের উদ্যোগের বিরুদ্ধেও প্রয়োজন অনুযায়ী অবস্থান নিতে পারছে।
তবে দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে বিরোধ বাড়লেও তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাক, এমনটি চায় না কোনো পক্ষই। শুক্রবার এরদোয়ানের একেপি দলের উপপ্রধান কুরশাদ জোরলু বলেন, দুই দেশ নিজেদের ‘পারিবারিক’ সমস্যাগুলো সমাধানের উপায় জানে। তাঁর বক্তব্যকে অনলাইনে উত্তেজনা কমানোর পরোক্ষ আহ্বান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার বাকুতে অনুষ্ঠিত একটি আঞ্চলিক সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান কঠিন সময়েও দুই দেশের নেতাদের মধ্যকার দৃঢ় সম্পর্কের প্রশংসা করেন।
সম্পর্ক ভাঙার ঝুঁকি নিতে চায় না কেউ
পর্যবেক্ষকদের মতে, তুরস্ক ও আজারবাইজানের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্কের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ জড়িত। ফলে সাম্প্রতিক মতবিরোধের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম।
এস্তোনিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কেন্দ্রের বিশ্লেষক ইভান ক্লিশচ বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে মাঝেমধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক এবং প্রতিবেশী ইরানকে ঘিরে সংঘাতের পরিস্থিতির কারণে আজারবাইজান তুরস্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারকে হারানোর ঝুঁকি নিতে পারে না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বিরোধের অনেক আগে থেকেই দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা চলছে, যা উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
তুরস্কের কাছে আজারবাইজান মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। মধ্য এশিয়াকে আঙ্কারা কৌশলগতভাবে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে, তুরস্কের তুলনায় আজারবাইজানের জনসংখ্যা অনেক কম হলেও জ্বালানি সম্পদ ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় দেশটির প্রভাব উল্লেখযোগ্য।
শাহবাজভের মতে, বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে দুই দেশের মধ্যে দ্রুত কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে আঙ্কারার অবস্থান ও উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হবে। আজারবাইজানের জ্বালানি খাতের প্রভাব এবং মধ্য এশিয়ায় প্রবেশাধিকারের কারণে দেশটি তুরস্কের সঙ্গে দর-কষাকষিতে বাড়তি সুবিধা পায় বলেও মনে করেন তিনি।
ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায় তুরস্ক। সে লক্ষ্যেও আজারবাইজানের সঙ্গে সহযোগিতা দেশটির জন্য মূল্যবান।
তুর্কি সাংবাদিককে গ্রেপ্তারে নতুন উত্তেজনা
দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধের মধ্যেই শুক্রবার আজারবাইজান জানিয়েছে, তুরস্কের দৈনিক সানলিউরফা ওলের সাংবাদিক জালাল চিফচির বিরুদ্ধে একটি ‘আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা’ জারি করা হয়েছে।
আজারবাইজানের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের অভিযোগ, চিফচি দেশটিতে অভ্যুত্থানের আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং ধর্মীয় চরমপন্থায় উসকানি দিয়েছিলেন।
এই ঘটনাও দুই দেশের মধ্যকার টানাপোড়েনকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তবে জ্বালানি সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মধ্য এশিয়ায় প্রবেশাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের কারণে বিরোধ নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উভয় দেশের জন্যই রয়ে গেছে।
সূত্র: দ্য ডন