
সরকারি ত্রাণের চালের হিস্যা নিজের মনমতো না পাওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে ঢুকে এক প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে (সচিব) বেদম মারধর এবং প্রকাশ্যে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুর দেড়টার দিকে বরিশালের মুলাদী উপজেলার মুলাদী সদর ইউনিয়ন পরিষদে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী ওই কর্মকর্তার নাম মো. জাকির হোসেন সিকদার। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত দুস্থ মানুষের জন্য আসা সরকারি ত্রাণের চাল বিতরণের তালিকা তৈরির সময় মুলাদী সদর ইউনিয়ন পরিষদের নিজ কার্যালয়ে এই হামলার শিকার হন তিনি। তাঁর অভিযোগ, উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব বেল্লাল হোসেন সরদার ও তাঁর অনুসারীরা এই হামলা ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। এই ঘটনায় জাকির হোসেন বাদী হয়ে মুলাদী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
কার্যালয়ে ঢুকে লাঞ্ছনা ও আধিপত্য প্রদর্শন
জিডি ও লিখিত অভিযোগের বিবরণ থেকে জানা যায়, মুলাদী সদর ইউনিয়নের নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষের সহায়তার জন্য সরকারিভাবে ৩ টন চাল বরাদ্দ করা হয়। মঙ্গলবার দুপুরে ইউপি সচিব মো. জাকির হোসেন সিকদার যখন নিজ কক্ষে বসে সুবিধাভোগীদের নাম তালিকাভুক্ত করছিলেন, তখন বেল্লাল হোসেন সরদার ও সুজন চৌকিদারসহ ৫-৬ জন ছাত্রদল নেতাকর্মী হঠাৎ সেখানে প্রবেশ করেন। কার অনুমতিতে এই তালিকা করা হচ্ছে— তা জানতে চেয়ে তারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে সরকারি কাজে বাধা দিয়ে ওই কর্মকর্তাকে চড়-থাপ্পড় ও কিল-ঘুসি মেরে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। কক্ষ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।
অভিযোগে ইউপি সচিব আরও উল্লেখ করেন, বেল্লাল সরদার এর আগেও তাঁর অফিস কক্ষের আসবাবপত্র ভাঙচুর করেছিলেন। এছাড়া বিগত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময় ভিজিএফ চাল বিতরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে মোট বরাদ্দের অর্ধেক (৫০ শতাংশ) চাল তাঁদের দিয়ে দেওয়ার দাবি করেছিলেন এই ছাত্রদল নেতা। এমনকি দরিদ্র নারীদের দুই বছর মেয়াদী ভিডব্লিউবি চালের কার্ড বিতরণের সময়ও তারা জোরপূর্বক কার্ড ছিনিয়ে নিয়েছিলেন।
৩০ জনের তালিকা নিয়ে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুলাদী সদর ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য ঘটনার ভেতরের তথ্য জানিয়ে বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ১৫০ জন মানুষের জন্য ২০ কেজি করে মোট ৩ টন চাল বরাদ্দ আসে। ওই বরাদ্দের ২০ শতাংশ হিসেবে ৩০ জনের একটি তালিকা দিতে চেয়েছিলেন বেল্লাল সরদার। কিন্তু পরিষদের পক্ষ থেকে তাকে ২০ জনের নাম দেওয়ার অনুরোধ করা হলে তিনি চটে যান। পরে চেয়ারম্যান তাকে ২৫ জনের নাম দিতে বলেন। চেয়ারম্যান পরিষদ থেকে বের হওয়ার পরপরই ওই ছাত্রদল নেতা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে মারধর ও গুলি করার হুমকি দেন।
অসুস্থতার কারণে ঘটনার দিন পরিষদ থেকে দ্রুত বের হয়ে গিয়েছিলেন জানিয়ে মুলাদী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামরুল আহসান বলেন:
"ঘটনার বিষয়টি শুনেছি। আমি অসুস্থ থাকায় ঘটনার দিন পরিষদ থেকে তাড়াতাড়ি বের হয়েছিলাম। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।"
অভিযোগ অস্বীকার ও প্রশাসনের বক্তব্য
হামলা ও হুমকির সমস্ত অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব বেল্লাল হোসেন সরদার বলেন:
"ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে মারধর কিংবা হত্যার হুমকি দেওয়া হয়নি। মঙ্গলবার আমি পরিষদে যাইনি। তবে ওইদিন কয়েকজনের সঙ্গে জাকির হোসেনের কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির বিষয়টি শুনেছি। আমি মুলাদী সদর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেওয়ায় আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও জিডি করা হয়েছে।"
আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে মুলাদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার মো. সোহেল রানা জানান:
"ইউপির প্রশাসনিক কর্মকর্তা জিডি করেছেন। ঘটনার বিষয়ে তদন্ত চলছে। সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
পুরো বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াচ্ছে উল্লেখ করে মুলাদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. গোলাম সরওয়ার বলেন:
"মারধর ও প্রাণ নাশের হুমকির বিষয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা লিখিত অভিযোগ করেছেন। থানায় জিডি হয়েছে এবং জিডি কপি আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। আদালতের নির্দেশনা পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"