
দলীয় ঐক্য অটুট রাখার পাশাপাশি ‘হাইব্রিড’ ও ‘গুপ্ত’দের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দলের ভেতরে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে তা যেন কোনোভাবেই ঐক্যে ফাটল না ধরায়। কারণ, ঐক্য অটুট থাকলে কোনো ফ্যাসিস্ট শক্তি বা গুপ্তচর দলের ভেতরে ঢুকে সুযোগ নিতে পারবে না।
সোমবার (১৩ জুলাই) বরিশালে অনুষ্ঠিত বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গুম, খুন ও চরম নির্যাতনের শিকার হয়েও আপনারা দলকে ধরে রেখেছেন। নিজের পরিবারের চেয়ে দলকে বেশি সময় ও অর্থ দিয়েছেন। তখন যদি সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেন, এখন কেন পারবেন না?’
তিনি বলেন, ‘দলের ভেতরে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তার জন্য যেন ঐক্য নষ্ট না হয়। ঐক্য থাকলে কোনো ফ্যাসিস্ট শক্তি বা গুপ্তচর দলে ঢুকে সুযোগ নিতে পারবে না। ঐক্যে ফাটল ধরলেই তারা সুযোগ নেবে।’
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘সাধারণ নির্বাচনে যেভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সেভাবেই দলকে বিজয়ী করতে হবে। বর্ষা শেষে আলোচনা করে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা হবে। এর আগেই তৃণমূলকে আরও শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করতে হবে। তবে দল গোছানোর ক্ষেত্রে “হাইব্রিড” ও “গুপ্ত”—এই দুটি বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে তারা কোনোভাবেই নেতৃত্বে আসতে না পারে।’
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আসন্ন ধর্মীয় উৎসবের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে এই উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে হবে। কেউ যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে।’
বিগত সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গত ১৭ বছরে উন্নয়নের নামে মূলত লুটপাট হয়েছে। মেগা প্রকল্পের আড়ালে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রস্তুত শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতি বছর গড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। ৫৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হয়েছে, অথচ একই দৈর্ঘ্যের ভূপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার কোটি টাকা।’
ফ্লাইওভার নির্মাণের নামে বিভিন্ন এলাকায় ড্রেন ও খাল ভরাট করায় কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
উন্নয়নের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তাঘাট নির্মাণ নয়; স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষির উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উপজেলা পর্যায়ে ৩১ শয্যার হাসপাতাল চালু করেছিলেন, বেগম খালেদা জিয়া তা ৫১ শয্যায় উন্নীত করেন। আমাদের সরকার এখন সেগুলো ১০১ শয্যায় উন্নীত করার কাজ করছে। পাশাপাশি সারাদেশে এক হাজার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে।’
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা গত ফেব্রুয়ারিতে একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে দায়িত্ব নিয়েছি। ব্যাংকিং খাত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। দায়িত্ব নিয়েই আমরা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু করেছি। রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় অতিরিক্ত ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।’
নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি পরিবারের সবাই যদি ঘর নোংরা করে, তাহলে একজনের পক্ষে তা পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। দেশও একটি পরিবারের মতো। আপনারা এখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। তাই দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় সবাইকে অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।’
সভায় বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।