
দুই দফা নাকচ হওয়ার পর ফের আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানি শেভরনের নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব। সুনামগঞ্জ, শেরপুর ও ময়মনসিংহ এলাকা নিয়ে গঠিত ১১ নম্বর ব্লক এবং হবিগঞ্জের ১২ নম্বর ব্লকের প্রায় ৬ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উন্নয়ন করতে চায় কোম্পানিটি।
বাংলাদেশে গ্যাস উত্তোলনে শীর্ষে থাকা শেভরন বর্তমানে প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। বিবিয়ানার আশপাশের আরও প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় কাজ করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছে কোম্পানিটি। এসব এলাকায় রশিদপুর, ছাতক ও সুনেত্রসহ কয়েকটি আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলো প্রস্তাবের আওতায় নেই। এসব ক্ষেত্রের বাইরে থাকা এলাকায় অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কার্যক্রম চালাতে চায় শেভরন।
বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। সে সময় শেভরনের পক্ষ থেকে ৮, ১১ ও ১২ নম্বর ব্লকের পার্শ্ববর্তী রশিদপুর এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তৎকালীন সরকার রশিদপুরের প্রস্তাব নাকচ করে ৮ ও ১১ নম্বর ব্লক নিয়ে আলোচনায় এগোনোর অনুমতি দিয়েছিল।
এরপর শেভরন বিস্তারিত প্রস্তাবে সমুদ্রভিত্তিক মডেল পিএসসি-২০২৩ অনুযায়ী চুক্তির প্রস্তাব দেয়। তবে পেট্রোবাংলা তা নাকচ করে দেয়। তাদের যুক্তি ছিল, গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে গ্যাসের দাম তুলনামূলক বেশি। স্থলভাগে একই দামে চুক্তি করা যৌক্তিক নয়।
গ্যাসের দামসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে মডেল পিএসসি-২০১৯ সংশোধন করে ২০২৩ সালে নতুন মডেল পিএসসি করা হয়। এতে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুডের দামের ১০ শতাংশ নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলার হলে গ্যাসের দাম হবে ১০ ডলার। এর আগে পিএসসি অনুযায়ী অগভীর ও গভীর সমুদ্রে গ্যাসের নির্ধারিত দাম ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৬ ও ৭ দশমিক ২৫ ডলার। শেভরনের ব্লক-১২ এলাকার বর্তমান ইজারা চুক্তিতে গ্যাসের দাম ২ দশমিক ৭৬ ডলার।
পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিও পিএসসি ছাড়া ব্লক ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব নাকচ করে। সম্প্রতি সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে চুক্তির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এরই মধ্যে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) শেভরনের বেস অ্যাসেটস ও ইমার্জিং কান্ট্রিজবিষয়ক প্রেসিডেন্ট জাভিয়ার লা রোসার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে পুরোনো ও বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে শেভরনের আগ্রহের বিষয়টি উঠে আসে।
তবে পুরোনো ও আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রের বিষয়টি আলোচনায় আসায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। তাদের আশঙ্কা, শেভরন দীর্ঘদিন ধরে ছাতক ও রশিদপুরের মতো প্রমাণিত গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ার চেষ্টা করছে। এসব ক্ষেত্রে প্রমাণিত মজুদ থাকা অবস্থায় বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হলে বর্তমান দরের তুলনায় অনেক বেশি দামে গ্যাস কিনতে হতে পারে।
ছাতক গ্যাসক্ষেত্রটি কানাডীয় কোম্পানি নাইকো উন্নয়নের সময় ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন দুই দফা বিস্ফোরণের শিকার হয়। পরবর্তী সময়ে ক্ষতিপূরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা চলায় দীর্ঘদিন ক্ষেত্রটির উন্নয়ন কার্যক্রম বন্ধ ছিল। মামলা নিষ্পত্তির পর নতুন করে কূপ খননের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ করছে বাপেক্স। তবে এ কার্যক্রমে দৃশ্যমান গতি নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিস্ফোরণের ঘটনায় ছাতক পশ্চিমের একটি স্তরের গ্যাস পুড়ে গেলেও অন্যান্য স্তর এবং ছাতক পূর্বের মজুদ অক্ষত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। সেখানে সম্ভাব্য গ্যাসের মজুদ ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
অন্যদিকে সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির পরিচালনাধীন রশিদপুরে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অবশিষ্ট গ্যাসের মজুদ ছিল প্রায় ১ দশমিক ৪৮ টিসিএফ। ক্ষেত্রটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স ১১ নম্বর ব্লকের একটি অংশে ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ করেছে। সম্ভাবনাময় এই ব্লকে প্রায় ২ দশমিক ৪৭ টিসিএফ গ্যাসের মজুদ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। শেভরন বাংলাদেশ এসব এলাকায় দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক জরিপ চালাতে চায়। জরিপের ফল ইতিবাচক হলে পরবর্তী ধাপে কূপ খননে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির।
বর্তমানে শেভরন বাংলাদেশ তিনটি ব্লক থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। এর মধ্যে ১২ নম্বর ব্লকে বিবিয়ানা, ১৩ নম্বর ব্লকে জালালাবাদ এবং ১৪ নম্বর ব্লকে মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। ১৩ সেপ্টেম্বর এই তিন গ্যাসক্ষেত্র থেকে শেভরন প্রতিদিন মোট ৮৬৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করেছে। একই দিনে দেশের সব দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের মোট উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট।
আইন অনুযায়ী, চুক্তির পর সাত বছর কোনো কার্যক্রম পরিচালনা না করলে সংশ্লিষ্ট এলাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেট্রোবাংলার অধীনে চলে যাওয়ার বিধান রয়েছে। শেভরন বাংলাদেশ ব্লক-১২-এর চুক্তির আওতাধীন কিছু এলাকা পরবর্তী সময়ে ছেড়ে দেয়। ২০২২ সালের অক্টোবরে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের ছেড়ে দেওয়া কিছু এলাকায় কূপ খননের জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা ও শেভরন বাংলাদেশের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সম্পূরক চুক্তি হয়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে শেভরন বাংলাদেশের ঢাকা কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার (মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন) শেখ জাহিদুর রহমান বলেন, এই মুহূর্তে শেভরন বাংলাদেশ তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রকাশ করতে চায় না।
তিনি বলেন, শেভরন বাংলাদেশ সরকার ও পেট্রোবাংলার সঙ্গে ৩০ বছর ধরে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ করে আসছে এবং দেশের জ্বালানি খাতের সম্ভাবনা অনুসন্ধান অব্যাহত রাখতে চায়।