
আসন্ন দুর্গাপূজাকে ঘিরে একাধিক নতুন নির্দেশনা দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার। মহাঅষ্টমীর দিন রাজ্যজুড়ে সব মদের দোকান ও বার বন্ধ রাখার পাশাপাশি প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রায় ডিজে সাউন্ড সিস্টেম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এর সঙ্গে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আমলে শুরু হওয়া বহুল আলোচিত ‘রেড রোড পুজো কার্নিভ্যাল’ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা এসেছে।
সোমবার এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় শারদীয় উৎসবের পরিবেশ সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন রাখতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
মহাঅষ্টমীতে বন্ধ থাকবে সব মদের দোকান
মহাঅষ্টমীর ধর্মীয় গুরুত্বের কথা তুলে ধরে মদের বিক্রিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন মুখ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘যেদিন আমরা মাতৃ চরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করি, সেদিন রাজ্যে সব ধরনের মদের দোকান ও বার পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। অষ্টমীর পবিত্র দিনে মদ বিক্রি করা চলবে না।’
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে দুর্গোৎসবের নির্দিষ্ট একটি দিনে মদ বিক্রির ওপর এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞার ঘটনা এবারই প্রথম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে বামফ্রন্ট কিংবা তৃণমূল কংগ্রেস—কোনো সরকারের সময়েই দুর্গাপূজার দিনে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
স্থায়ীভাবে বন্ধ রেড রোড পুজো কার্নিভ্যাল
মমতা ব্যানার্জির দ্বিতীয় মেয়াদে শুরু হয়েছিল রেড রোডের জাঁকজমকপূর্ণ ‘পুজো কার্নিভ্যাল’। এবার সেই আয়োজন পুরোপুরি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।
কলকাতার সেরা প্রতিমাগুলো বিসর্জনের আগে শোভাযাত্রার মাধ্যমে রেড রোডে প্রদর্শন করা হতো। এই আয়োজন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কও হয়েছে।
বিশেষ করে গত বছর উত্তরবঙ্গে ভয়াবহ বন্যা ও ধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি চলার সময় কলকাতায় মমতা ব্যানার্জির উপস্থিতিতে জাঁকজমকপূর্ণ পুজো কার্নিভ্যাল আয়োজন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা হয়েছিল।
তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিজেপি ওই কার্নিভ্যালকে উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রতি অবহেলার প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছিল।
বিসর্জনের শোভাযাত্রায় ‘নো ডিজে’
এবার প্রতিমা বিসর্জনের সময় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিসর্জনের শোভাযাত্রায় সব ধরনের ‘ডিজে মিউজিক’ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
শুধু শব্দ নিয়ন্ত্রণ নয়, বিসর্জনের সময়সীমা নিয়েও নতুন নির্দেশনা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। লক্ষ্মীপূজার অন্তত এক দিন আগে রাজ্যের সব ক্লাব ও পূজা কমিটিকে প্রতিমা বিসর্জনের কাজ শেষ করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
থিম পূজায় সনাতনী ঐতিহ্য রক্ষার আহ্বান
কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় ‘থিম পূজা’ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সেই বাস্তবতায় পূজা কমিটিগুলোকে সনাতনী ঐতিহ্য ও ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি মাথায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।
তিনি বলেন, ‘প্রতিমা, মণ্ডপ, থিম কিংবা অলংকরণের নামে এমন কিছু করবেন না যা সনাতন ধর্মীয় অনুভূতি বা বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে আঘাত হানে।’
শুভেন্দুর এই বক্তব্যের সুর মূলত আরএসএস-সংশ্লিষ্ট বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) অবস্থানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পূজা কমিটিকে ১ লাখ টাকা করে অনুদান
আগের সরকারের চালু করা ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই এবারও রাজ্যের প্রতিটি নিবন্ধিত পূজা কমিটিকে এক লাখ টাকা করে সরকারি অনুদান দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।
এর পাশাপাশি পূজামণ্ডপে বিনা মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাও থাকবে। ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই করপোরেশন (সিইএসসি) এবং রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদের মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।
পাশাপাশি পূজামণ্ডপের জন্য বাধ্যতামূলক ফায়ার সেফটি লাইসেন্সের ফিও মওকুফ করা হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
বড় বাজেটের পূজায় অনুদান না নেওয়ার অনুরোধ
তবে আর্থিকভাবে সচ্ছল ও বড় বাজেটের পূজা আয়োজনকারী কমিটিগুলোর প্রতি সরকারি অনুদান না নেওয়ার বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আমি ক্ষমতার অপব্যবহার বা জোর করে কিছু চাপিয়ে দিতে চাই না। তবে যাদের সামর্থ্য আছে এবং বড় বাজেট রয়েছে, তারা সরকারের এই অনুদান না নিয়ে বিজ্ঞাপন বা চাঁদার ওপর ভরসা রাখুন। সরকারি সহায়তার ওপর পুজো কমিটির মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা একটি খারাপ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।’
অর্থাৎ, যেসব পূজা কমিটির নিজেদের পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে এবং বড় বাজেটে আয়োজন করা হয়, তাদের সরকারি অর্থের ওপর নির্ভর না করে বিজ্ঞাপন কিংবা চাঁদার মাধ্যমে ব্যয় নির্বাহের আহ্বান জানিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।