
স্বামী হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের পরিবারের করা পাল্টা মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছিল ফাতেমা বেগমকে। সঙ্গে ছিল মাত্র ১৫ মাস বয়সী দুগ্ধপোষ্য সন্তান। সাত দিন কারাভোগের পর অবশেষে জামিন পেয়েছেন তিনি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মহেশখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসাইনের আদালত ফাতেমার জামিন মঞ্জুর করেন। একই দিন বিকেলের পর কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
ফাতেমার আইনজীবী মো. আনছার জানিয়েছেন, এক হাজার টাকা বন্ডে স্থানীয় একজন গণ্যমান্য ব্যক্তির জিম্মায় তার জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জামিনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে কারাগারে পৌঁছানোর পর সোমবার বিকেলের পর ফাতেমাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
আইনজীবী মো. আনছার আরও জানান, প্রতিপক্ষের করা মামলায় সাত দিন কারাগারে থাকার পর আদালত সোমবার ফাতেমার জামিন মঞ্জুর করেছেন।
যে ঘটনায় স্বামীকে হত্যা করা হয়েছিল
ফাতেমার পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের কবির বাজারে কথা কাটাকাটির জেরে ফিশিংবোটের শ্রমিক মুহাম্মদ কাশেমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা বেগম বাদী হয়ে মহেশখালী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় স্থানীয় রাসেলসহ মোট ১০ জনকে আসামি করা হয়।
চার মাস পর ফাতেমার বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা
কাশেম হত্যার ঘটনার প্রায় চার মাস পর ফাতেমাসহ সাতজনের বিরুদ্ধে আদালতে পাল্টা মামলা করা হয়।
২০২৫ সালের ৩ আগস্ট কাশেম হত্যা মামলার ৪ নম্বর আসামি রাসেলের মা নুর জাহান বেগম এই মামলা করেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, একই বছরের ২৪ মে ফাতেমাসহ সাতজন রাসেলের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছেন।
পরে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় মহেশখালী থানা। তদন্ত শেষে থানার এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
‘আমরা কোনো সাক্ষ্য দিইনি’
তবে তদন্ত প্রতিবেদনে সাক্ষী হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের কয়েকজনই অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন কথা বলেছেন।
তাদের দাবি, ওই মামলায় তারা কোনো সাক্ষ্য দেননি। এমনকি ২০২৫ সালের ২৪ মে রাসেলের বাড়িতে ভাঙচুর কিংবা লুটপাটের কোনো ঘটনাই ঘটেনি বলেও তারা জানান।
তবে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম এ দাবি নাকচ করে বলেছেন, সাক্ষীদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
১৫ মাসের শিশুকে নিয়েই কারাগারে ফাতেমা
এই মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর গত ৩১ আগস্ট রাতে ফাতেমা, তার শাশুড়ি রাশেদা বেগম এবং বেড়াতে আসা মেয়ে নাছিমা আকতারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরদিন তাদের আদালতে হাজির করা হলে রাশেদা বেগম ও নাছিমা জামিন পান। তবে ১৫ মাস বয়সী শিশুসহ ফাতেমাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।
ফলে দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই কারাগারে যেতে হয় স্বামীহারা ফাতেমাকে।
দুই স্কুলপড়ুয়া মেয়েকেও থাকতে হয় এতিমখানায়
ফাতেমা কারাগারে যাওয়ার পর তার আরও দুই স্কুলপড়ুয়া মেয়ের দেখাশোনার ব্যবস্থাও বদলে যায়। তাদের এতিমখানায় রাখা হয়।
ফাতেমার বড় মেয়ে রাজমিন আকতার চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। ছোট মেয়ে মিশকাত জান্নাতের পড়াশোনা প্রথম শ্রেণিতে।
অর্থাৎ, মাকে কারাগারে যেতে হওয়ায় ১৫ মাস বয়সী শিশুটি মায়ের সঙ্গে কারাগারে ছিল, আর তার দুই স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে থাকতে হয় এতিমখানায়।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা
৭ সেপ্টেম্বর দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ ফাতেমার কারাভোগের বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
এর মধ্যেই একই দিন আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন এবং পরে কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখার পর কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এম এ মান্নান ফাতেমাকে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য জেলা লিগ্যাল এইডকে নির্দেশনা দেন।
একই সঙ্গে বিষয়টি দেখভালের জন্য জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতিকেও অনুরোধ করেন জেলা প্রশাসক।
সবশেষে এসব উদ্যোগ ও আদালতের জামিনের আদেশের পর হতদরিদ্র পরিবারের স্বামীহারা বধূ ফাতেমা কারামুক্ত হয়েছেন।
ফাতেমার জামিনের বিষয়ে জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে একজন মায়ের কারাগারে থাকা তাদের কাছে অমানবিক মনে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দুগ্ধপোষ্য সন্তান নিয়ে একজন মায়ের কারাবাস আমাদের কাছে অমানবিক মনে হয়েছে। ওনি জামিন পেয়েছেন, এটা সুখবর। মামলার বিষয়টা ওনি লিগ্যাল এইডের সাহায্যে মিউচ্যুয়াল করতে পারেন।’