
ভোলার ইলিশা ঘাটে ফেরির দীর্ঘ প্রতীক্ষার কারণে নদীপাড়াপার হতে পারছে না তরমুজ বোঝাই ট্রাক। এর ফলে ট্রাকে থাকা লাখ লাখ টাকার তরমুজ ঘাটেই পচন ধরছে, আর এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ট্রাকচালকরা জানান, তারা গত দুই থেকে তিন দিন ধরে ফেরি সংকটের কারণে তরমুজ নিয়ে ঘাটে আটকে রয়েছেন।
এছাড়া মেঘনা নদীর নাব্য সংকট এবং ঘাটের অপ্রতুল ব্যবস্থাপনার কারণে ব্যবহারকারীরা ভুগছেন। তরমুজ বোঝাই ট্রাক থেকে ইলিশা ও লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরী ফেরিঘাটে নামের অজ্ঞাত চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠেছে।
ভোলা দ্বীপজেলার কৃষিপণ্য সাধারণত স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য জেলা সরবরাহ করা হয়। এ জেলার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌপথ।
সোমবার (৩০ মার্চ) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ইলিশা ফেরিঘাট ও এর আশপাশের সড়ক ঘুরে দেখা যায়, ফেরিতে ওঠার জন্য প্রায় দেড় কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে প্রায় অর্ধশত ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। অধিকাংশ ট্রাকে থাকা তরমুজ পচন ধরায় সড়কের পাশে ফেলা হচ্ছে। প্রতিটি ট্রাকে ৪ থেকে ৬ লাখ টাকার তরমুজ রয়েছে। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় পরিবহন শ্রমিকদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে। তদুপরি, ঘাটে বিশ্রামাগার ও শৌচাগারের অভাবে দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
চরফ্যাশন থেকে চট্টগ্রামগামী তরমুজ বোঝাই ট্রাক নিয়ে দুই দিন ধরে ঘাটে অপেক্ষমান ট্রাকচালক মো. মহিউদ্দিন ও ছিদ্দিক বলেন, “গতকাল দুপুরে ভোলার চরফ্যাশন থেকে তরমুজ বোঝাই করে ইলিশা ফেরিঘাটে এসেছি। ভেবেছিলাম দ্রুত সময়ের মধ্যেই ফেরিতে উঠতে পারব। কিন্তু হয়েছে উল্টো, এখন ফেরির অপেক্ষায় আছি। কখন নাগাদ গাড়ি ফেরিতে উঠাতে পারব তাও জানি না।”
বোরহানউদ্দিন থেকে ঘাটে আসা ট্রাকচালক কাদের ও শাজাহান অভিযোগ করেন, “ইলিশা ফেরিঘাট দেশের অন্যতম ব্যস্ত ঘাট। দৈনিক শত শত যানবাহন পারাপার হয়। অথচ ঘাটে ন্যূনতম সংস্কারও নেই। প্রতিটি ট্রাকে ২-৩ জন শ্রমিক থাকে। তরমুজের মালিক আমাদের গাড়িতে তাদের মূল্যবান সম্পদ দিয়েছে। কিন্তু ঘাটে এসে ফেরির অপেক্ষায় ট্রাকে থাকা তরমুজ ও অন্যান্য কাচামাল পচন ধরেছে। বাধ্য হয়ে তা রাস্তার পাশে ফেলে দিতে হচ্ছে। এসব পচনশীল, আমরা কী করব?”
তারা আরও অভিযোগ করেন, “ঘাটে কোনো পার্কিং ব্যবস্থা নেই, গাড়ি রেখেছি মূল রাস্তার ওপর অথচ আমাদের থেকে পার্কিং চার্জ নেওয়া হচ্ছে। ট্রাক চালকরা যেভাবে ঘাটে বিশ্রাম নেবেন এবং টয়লেটে যাবেন তার কোনো ব্যবস্থা নেই। শুনেছি মাত্র ৪টি ফেরি চলাচল করছে। নদীর নাব্য সংকটে প্রতিটি ফেরি ইলিশা থেকে মজুচৌধুরী ঘাটে পৌঁছাতে ৬-৭ ঘণ্টা সময় নিচ্ছে, যা আগে ৩-৪ ঘণ্টা লাগত। আসলে আমাদের দুর্দশার শেষ নেই।”
ট্রাকচালক মো. মোশাররফ বলেন, “দুই দিন পর আজ দুপুরে গাড়ি ফেরিতে ওঠার সিরিয়াল পেয়েছি। নদীর নাব্যতা সংকটে ইলিশা থেকে মজুচৌধুরী ঘাটে পৌঁছাতে পারবো কি না জানি না। গাড়িতে প্রায় ৬ লাখ টাকার তরমুজ রয়েছে।”
অন্য ট্রাকচালকরা ইউনুস ও হাসনাতও অভিযোগ করেন, “ইলিশা ঘাটে কোনো ট্রাক স্ট্যান্ড নেই, তবুও ফেরি ও ঘাট ইজারাদারের লোকজন স্লিপের মাধ্যমে টাকা নিচ্ছে। গাড়ি ফেরিতে উঠলেই ঘাটের চার্জ দিতে হয়, অথচ আমরা গাড়ি রাস্তার উপর রেখেছি।”
চরফ্যাশনের দক্ষিণ আইচা থানা এলাকার তরমুজ চাষি বাবুল পলোয়ান, আব্দুর রব ও তুহিন বলেন, “আমরা শেষ সম্বল তরমুজ উৎপাদনের পেছনে ব্যয় করেছি। স্থানীয় বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ঢাকায় বিক্রির জন্য ট্রাক নিয়ে এসেছি। কিন্তু ফেরি সল্পতা ও বিআইডব্লিউটিসির অব্যবস্থাপনায় লাখ লাখ টাকার তরমুজ ঘাটেই পচছে। গরমের কারণে ইতিমধ্যে কিছু তরমুজ নষ্ট হয়েছে, ক্ষতিপূরণ দেবে কে?”
বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. শাহাবুউদ্দিন ফরাজি বলেন, “ভোলা দেশের তরমুজ উৎপাদনের প্রধান জেলা। অথচ ইলিশা ঘাটে কৃষিপণ্য ও কৃষকদের কোনো নিরাপত্তা নেই। তরমুজ বোঝাই ট্রাক থেকে চলছে নিরব চাঁদাবাজি। এসব চাঁদা কৃষকদের পকেট থেকে যাচ্ছে, অথচ আমরা বাজারে বিক্রি করে উৎপাদন খরচও তুলতে পারছি না। এছাড়া ফেরির অপেক্ষায় তরমুজ পচছে।”
তবে ইলিশা ফেরিঘাটের বিআইডব্লিউটিসির ব্যবস্থাপক কাওসার আহমেদ খান দাবি করেন, “ফেরি সংকট নেই এবং তরমুজ বোঝাই ট্রাক পারাপার স্বাভাবিক রয়েছে। ইলিশা-মজুচৌধুরী রুটে ৫টি ফেরি চলাচল করছে। সমস্যা মূলত নদীর নাব্য সংকটে জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভর করে। ঘাটে আমাদের কেউ তরমুজ ট্রাক থেকে অতিরিক্ত টাকা নেয় না।”
এদিকে ভোলা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ বছর ভোলায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে তরমুজ উৎপাদন হয়েছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দ্রুত সমস্যার সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।