
প্যাডেল রিকশা বন্ধ, সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য নিরাপদ ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমোদন ও এ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন এবং জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জাতীয় অর্থনীতি সুরক্ষায় প্রাইভেট কারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবিতে সরকারকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) জনস্বার্থে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন এই নোটিশ পাঠান।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে নোটিশটি দেওয়া হয়েছে।
প্রাইভেট কারে বিপুল জ্বালানি ব্যয় ও সড়ক দখল
আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম মানুষ প্রাইভেট কার ব্যবহার করেন। অথচ এই অল্পসংখ্যক মানুষের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত গাড়িই সড়কের বড় একটি অংশ দখল করে রাখে।
এ ছাড়া প্রতিদিন এসব গাড়িতে বিপুল পরিমাণ আমদানিকৃত জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। এর ফলে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সরকারি জ্বালানি ভর্তুকির ওপর অযৌক্তিক অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রাইভেট কার থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও সূক্ষ্ম বস্তুকণার মতো বিষাক্ত ধোঁয়া বায়ুদূষণ বাড়াচ্ছে। এর ফলে জনস্বাস্থ্য এবং মানুষের ‘জীবনের অধিকারের’ ওপর গুরুতর হুমকি তৈরি হচ্ছে।
প্যাডেল রিকশায় শ্রমজীবীদের শারীরিক ক্ষতি
নোটিশে বলা হয়েছে, দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ প্রতিদিনের যাতায়াতের জন্য গণপরিবহন ও রিকশার ওপর নির্ভরশীল। চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে প্রান্তিক নাগরিকদের একটি অংশ বাধ্য হয়ে প্যাডেল রিকশা চালানোর মতো কঠোর কায়িক শ্রমে যুক্ত হচ্ছেন।
দাবদাহ, বৃষ্টি, যানজট ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও যাত্রী বহন করে রিকশা টানতে হয় তাদের। এ ধরনের কঠোর পরিশ্রমের কারণে দীর্ঘস্থায়ী পেশি ও অস্থিসন্ধির ক্ষয়, অকাল বার্ধক্য এবং অপুষ্টির মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলেও নোটিশে দাবি করা হয়েছে।
আইনি নোটিশে বলা হয়, কেবল বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই এই শ্রম গ্রহণ করতে হচ্ছে; এটি কোনোভাবেই স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া পেশা নয়। বরং দারিদ্র্যের শৃঙ্খলে আটকে থাকা এক ধরনের নির্মম ‘আধুনিক দাসত্ব’। সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদে জবরদস্তিমূলক শ্রম নিষিদ্ধ থাকায় সরকারকে দ্রুত প্যাডেল রিকশা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
নিরাপদ ব্যাটারিচালিত রিকশার নীতিমালার দাবি
প্রযুক্তির বিকাশ এবং ‘প্রোডাক্ট লাইফ সাইকেল’ তত্ত্বের আলোকে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে স্থানীয় পরিবহনের স্বাভাবিক, প্রয়োজনীয় ও মানবিক আধুনিক রূপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে নোটিশে।
দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এই পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধ করা হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে নোটিশে দাবি করা হয়।
এ কারণে গতি নিয়ন্ত্রণ, ব্রেকিং ব্যবস্থা, ব্যাটারির মান, কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং বৈজ্ঞানিক চার্জিং ব্যবস্থাসহ একটি সুস্পষ্ট নীতিমালার আওতায় নিরাপদ ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমোদন দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়, ব্যাটারিচালিত রিকশায় ব্যবহৃত বিদ্যুৎ রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় নয়। বরং দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষের যাতায়াত, কর্মসংস্থান, বাজারে যাওয়া, স্কুল-কলেজে যাতায়াত, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ এবং প্রতিদিনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে এই বিদ্যুৎ ব্যবহার যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত।
এতে আরও বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোর অর্থ হলো দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজার প্রতিদিন সচল রাখা জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করা। জাতীয় সম্পদের সুষম বণ্টনের নীতির সঙ্গেও এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাইভেট কারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ করের দাবি
আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন নোটিশে উল্লেখ করেন, সংবিধানের ২১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সম্পদ সংরক্ষণ করা প্রত্যেক নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব।
জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় প্রাইভেট কারের ওপর অবিলম্বে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং উচ্চহারে পরিবেশ কর নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বেকারত্ব কমাতে রাইড শেয়ারিং, রেন্ট-এ-কার এবং মিটারভিত্তিক গাড়ি সেবাকে উৎসাহিত করার কথাও বলা হয়েছে।
১০ দিনের সময়, ব্যর্থ হলে হাইকোর্টে রিট
আইনি নোটিশে আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্যাডেল রিকশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, নিরাপদ ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য নীতিমালা তৈরি এবং প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনস্বার্থে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।