
স্বার্থপরতার এই আধুনিক যুগে যেখানে সামান্য স্বার্থের টানে মানুষ সম্পর্ক ভেঙে ফেলে, সেখানে বন্ধুত্বের মর্যাদা ধরে রাখতে জীবনের সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করার এক বিরল নজির গড়েছেন দুই বন্ধু। স্রেফ বিয়ের পর বন্ধুত্বের গভীরতা কমে যেতে পারে বা দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে—এই আশঙ্কায় জীবনের ৫৬টি বসন্ত পার করেও অবিবাহিত থেকে গেছেন তাঁরা।
অনন্য এই বন্ধুত্বের নজির গড়ে সমাজ তথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসায় ভাসছেন মাগুরার দুই বাসিন্দা গোলাম সরোয়ার এবং শ্যামল দত্ত।
গোলাম সরোয়ার একজন মুসলিম এবং শ্যামল দত্ত একজন সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বী। প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের ভিন্নতা থাকলেও, শৈশব থেকেই এই দুই বন্ধুর হৃদয়ের বন্ধন ছিল অভিন্ন। একসঙ্গে খেলাধুলা, পড়াশোনা আর বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক কেবল গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। ধর্ম যে কখনো দুটি মানুষের হৃদয়ের মিলনের পথে বাধা হতে পারে না, সরোয়ার ও শ্যামল তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সাধারণত মানুষের জীবনে একটা বয়সের পর সংসার বা পারিবারিক জীবনের তাগিদ আসে। কিন্তু এই দুই বন্ধুর ভাবনাকাহিনি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন, বিয়ে করলে হয়তো দুজনের আলাদা পরিবার, সংসার ও ভিন্ন দায়িত্ববোধ তৈরি হবে। আর সংসারের সেই নতুন মানুষের আগমনে তাঁদের এই নিখাদ শৈশবের বন্ধুত্বে ফাটল বা মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
সময়ের ভাগাভাগি কিংবা পারিবারিক ব্যস্ততা তাঁদের এই আত্মিক বন্ধনকে যেন কোনোভাবেই নষ্ট না করে, মূলত সেই গভীর ভালোবাসার জায়গা থেকেই দুজনে চিরকাল অবিবাহিত থেকে একসাথে জীবন পার করার এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নেন।
বিয়ে না করার এই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সামাজিক প্রেক্ষাপটে মোটেও সহজ ছিল না। সমাজ, আত্মীয়-স্বজন ও চারপাশের মানুষের নানা প্রশ্ন, কটূক্তি এবং পারিবারিক চাপ উপেক্ষা করতে হয়েছে তাঁদের। তবে সমস্ত প্রতিকূলতার মুখেও একে অপরের হাত ছাড়েননি তাঁরা। জীবনের সমস্ত সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা নিজেদের মধ্যেই ভাগ করে নিয়েছেন। জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে বার্ধক্যের দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়েও তাঁরা একসঙ্গেই আছেন এবং একে অপরকে আগলে রাখছেন।
সম্প্রতি কিছু গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে এই দুই বন্ধুর জীবনের এক অনন্য ও আবেগঘন ভিডিওচিত্র প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই তা ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যায়। তাঁদের এই ত্যাগের গল্প মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। অনেক নেটিজেন মন্তব্য করেছেন, "এটি কেবল একটি গল্প নয়, এটি হলো ভালোবাসার এক নিঃস্বার্থ ইশতেহার।"
মাগুরার এই দুই বন্ধুর গল্প প্রমাণ করে—জগতে সব সম্পর্ককে হয়তো রক্তের সুতোয় বা ধর্মের বৃত্তে মাপা যায় না, কিছু সম্পর্ক টিকে থাকে কেবল বিশ্বাসের ওপর ভর করে। জীবনের বাকি দিনগুলোও একে অপরের পরিপূরক হয়ে, হাসিমুখে পার করে দিতে চান এই দুই পরম বন্ধু।