
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, কূটনীতি এবং নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সবিস্তার ও খোলামেলা কথা বলেছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের খ্যাতনামা দৈনিক ‘এই সময়’-কে দেওয়া এক দীর্ঘ একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি গণভবন ছাড়ার প্রেক্ষাপট, পদত্যাগপত্র না দেওয়ার কারণ থেকে শুরু করে বিএনপি-জামায়াত জোটের বর্তমান শাসন আমল ও ঢাকার ‘নতুন কূটনীতি’ নিয়ে একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন।
ডক্টর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই ঢাকার সাথে ইসলামাবাদের মাখামাখি এবং নতুন নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলে পাকিস্তানের সাথে সখ্যতা বৃদ্ধি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে যে তুমুল আলোচনা চলছে, সেটিকে ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’ হিসেবে চালাতে চায় বর্তমান প্রশাসন। তবে বিষয়টিকে একেবারেই ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তার পর্যবেক্ষণ:
"রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখা আর পাকিস্তানি ভাবধারায় রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে নেওয়া, দুটো এক বিষয় নয়।"
ইতিহাসের সত্য ও পাকিস্তানের অতি ঘনিষ্ঠতা
পাকিস্তানের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সীমারেখা টেনে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, "পাকিস্তানের সঙ্গে যে কোনও সম্পর্ক হতে হবে ইতিহাসের সত্যকে স্বীকার করে, ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা রক্ষা করে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও আত্মসম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে। কিন্তু আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুর্বল করা, পাকিস্তানপন্থী শক্তিকে পুনর্বাসিত করা, সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানো এবং তরুণ প্রজন্মকে পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঠেলে দেওয়ার যে চেষ্টা চলছে— তার মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।"
সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বাংলাদেশে যে ক্ষমতার রদবদল হলো, প্রথমে ইউনূস ও পরবর্তীতে তারেক রহমানের শাসনামলে দেশ কি পাকিস্তানের অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে? মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের এই অবস্থানগত পরিবর্তনকে তিনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
জবাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যারা আজ পাকিস্তানের সঙ্গে এই অতি ঘনিষ্ঠতাকে ‘নতুন কূটনীতি’ বলে প্রচার করছেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন— পাকিস্তান কি ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিক ভাবে ক্ষমা চেয়েছে? তারা কি যুদ্ধাপরাধের দায় স্বীকার করেছে? তারা কি বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতকে সম্মান দিয়েছে? যদি না করে, তা হলে এত তাড়াহুড়ো করে সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা কেন? পাকিস্তানের সঙ্গে এই অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা শুধু কূটনৈতিক বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। যারা ১৯৭১–কে ভুলে যান, তারা বাংলাদেশকে বুঝতে পারেন না। যারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ছায়ায় ফেরাতে চান, তারা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিপজ্জনক খেলা খেলছেন।"
মৌলবাদ, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও ‘একই মুদ্রার দুই পিঠ’
গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর অনেক ভোটারই দাবি করেছিলেন যে, জামায়াতে ইসলামীর মতো ‘মৌলবাদী শক্তি’কে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে দূরে রাখতেই তারা বাধ্য হয়ে বিএনপিকে বেছে নিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার জামায়াত-বিরোধী ম্যান্ডেটের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বেশ কড়া ভাষায় উত্তর দেন।
তিনি বলেন, "যারা ভেবেছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে জামায়াতের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো হবে, তারা ইতিহাস ভুলে গিয়েছিলেন। বিএনপি ও জামায়াত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিএনপির হাত ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামির পূনর্বাসন হয়েছে। জামায়াত বিএনপির দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী, মুখে ভিন্ন নীতি-আদর্শের কথা বললেও তারা উভয়েই মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী রাজনৈতিক চেতনার অংশীদার। এদের ভিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।"
একই সাথে দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি নিয়ে বর্তমান সরকারের দিকে আঙ্গুল তুলে শেখ হাসিনা পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন, "যদি মানুষ জামায়াতকে ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিয়ে থাকে, তা হলে বিএনপি কেন মৌলবাদী শক্তিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? কেন মাজারে হামলা হচ্ছে? কেন সুফিদের দরগা নিরাপদ নয়? কেন সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছেন? কেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আহমদিয়া, আদিবাসী— কেউই নিরাপদ বোধ করছেন না? কেন পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃতি, প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি সব জায়গায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার উপরে আঘাত আসছে?"
নয়াদিল্লির ‘নতুন ইনিংস’ ও ভারতের কাছে প্রত্যর্পণ ইস্যু
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে শেখ হাসিনার কাছে জানতে চাওয়া হয়, বর্তমান বিএনপি সরকারের সাথে ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি ‘নতুন ইনিংস’ বা নতুন অধ্যায় শুরু করেছে। এর ফলে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হচ্ছে কি না? তাছাড়া, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্বার্থে ভারত যদি তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে ঢাকা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে চায়, তবে তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে?
এই স্পর্শকাতর প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা অত্যন্ত অবিচল কণ্ঠে বলেন, "একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত তাদের কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশে যে সরকার ক্ষমতায় থাকুক, তাদের সঙ্গে ভারতের যে যোগাযোগ থাকবে এটাই স্বাভাবিক।"
তিনি আরও যোগ করেন, "এর সঙ্গে আমার অবস্থান দুর্বল হওয়ার প্রশ্ন জড়িত নয়। কারণ আমার অবস্থান নির্ভর করে বাংলাদেশের মানুষের উপরে। আমি ভারতের জনগণ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ কঠিন সময়ে তারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আমার অবস্থান অন্য কোনও রাষ্ট্র কিংবা সরকারের সমর্থনের উপরে নির্ভরশীল নয়। সরকারে থাকতে আমি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করেছি বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে। কিন্তু বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কখনও বিসর্জন দিইনি।"
বর্তমান তারেক রহমান সরকারের সাথে ভারতের এই নতুন সুসম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত টিকবে না বলেই মনে করেন শেখ হাসিনা। সম্পর্কের স্থায়িত্ব নিয়ে নিজের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরে তিনি সাক্ষাৎকার শেষ করেন এই বলে, "দু’দেশের টেকসই সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি হলো বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা। যারা এগুলো নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, প্রতিনিয়ত হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভারত-বিরোধী অপপ্রচারকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন এবং অতীতে ভারতের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাদের সঙ্গে ভারতের কোনও নতুন ইনিংসই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা নয়।"