
পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) এমন এক বিক্ষোভের সাক্ষী হয়েছে শহরবাসী, যেখানে প্রতিবাদকারীদের কেউ মানুষ নয়—প্রায় ৩০টি রোবট। পতাকা হাতে নিয়ে, স্লোগান দিতে দিতে এবং কখনো গোল হয়ে হেঁটে ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছে এসব রোবট।
তাদের মূল দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এর ব্যবহার ও রোবটকরণের বিষয়ে দ্রুত নিয়ম-নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
মানুষের চাকরি কি দখল করবে রোবট?
এই ব্যতিক্রমী বিক্ষোভের আয়োজন করে ‘ডেমোক্র্যাটিজম’ নামের একটি সংগঠন। সংগঠনটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এআই ও রোবটকরণ মানুষের কর্মসংস্থানের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে সামাজিক পর্যায়ে আলোচনা তৈরি করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া রোবটগুলোর চেহারা ও গঠনেও ছিল বৈচিত্র্য। সেখানে দুই পায়ে হাঁটতে সক্ষম মানবাকৃতির রোবট যেমন ছিল, তেমনি ছিল কুকুরের মতো দেখতে চার পায়ের রোবটও।
বিক্ষোভস্থলে লাউডস্পিকারে বারবার শোনা যায় বিভিন্ন স্লোগান। এর মধ্যে ছিল—‘কর্মসংস্থান রক্ষা করো’, ‘নিয়ম চাই’ এবং ‘দেরি না করে নিয়ন্ত্রণ চালু করো’।
‘এই প্রযুক্তি এখন আর কল্পনা নয়’
এজিবট এ৩ নামের একটি মানবাকৃতির এআই রোবট এএফপিকে জানায়, বিক্ষোভে রোবটগুলোর উপস্থিতির মধ্য দিয়ে মূলত একটি বিষয়ই সামনে আনা হচ্ছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট প্রযুক্তি এখন আর কল্পনার বিষয় নয়, এটি বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে।
সংগঠনের আয়োজক গ্রেগোর্জ কুলিস বলেন, মানুষের বুদ্ধিভিত্তিক কাজ মানবাকৃতির রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হওয়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেটিই বিশেষভাবে তুলে ধরতে চেয়েছেন তারা।
তার ভাষায়, ‘আমরা বিশেষভাবে বলতে চাই মানবাকৃতির রোবট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মানুষের বুদ্ধিভিত্তিক কাজ প্রতিস্থাপিত হওয়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, সেই বিষয়টি নিয়ে। এখন প্রতিক্রিয়া না দেখালে শিগগিরই বড় সমস্যায় পড়তে পারি। শ্রমিকদের সুরক্ষায় নিয়ম ও আইনের দরকার।’
কুলিস জানান, রোবটগুলোকে বিক্ষোভে নিয়ে আসার পেছনে একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং বর্তমানে এসব যন্ত্র কতটা সক্ষম হয়ে উঠেছে, তা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা।
তিনি বলেন, ‘এই রোবটগুলো এখনই নিজে নিজে চলাফেরা করতে পারছে। এরা এখনই বিক্ষোভ করতে পারছে।’
অর্থাৎ, রোবটকে সামনে রেখে আয়োজকেরা শুধু এআই নিয়ন্ত্রণের দাবিই তোলেননি; একই সঙ্গে প্রযুক্তির বর্তমান সক্ষমতাও বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন।
বিক্ষোভস্থলে ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রী
বিক্ষোভ চলার সময় ঘটনাস্থলে পৌঁছান পোল্যান্ডের ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রী ক্রিশতফ গাভকোভস্কি। তিনি আয়োজক গ্রেগোর্জ কুলিসের সঙ্গে কথা বলেন।
মন্ত্রীও এআই ও রোবটকরণকে ঘিরে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রণহীন এআই মডেল যখন মানবাকৃতির রোবটের মধ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং রোবটকরণ ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এটি বড় ধরনের সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
প্রযুক্তির গতি নিয়ে উদ্বেগ কুলিসেরও
গ্রেগোর্জ কুলিস নিজে একটি রোবোটিকস কোম্পানির প্রধান তথ্য কর্মকর্তা (সিআইও)। একই সঙ্গে তিনি একটি নিয়োগ সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
এর আগে পরিবার, শ্রম ও সামাজিক নীতি মন্ত্রণালয়ের শ্রমবাজার কাউন্সিলে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
কুলিস বলেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন খুব দ্রুত এবং গতিশীলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন সম্পর্কে সমাজকে অবহিত করা এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা তৈরি করার দায়িত্ব তারা অনুভব করেন।
তবে শুধু সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েই যে তার উদ্বেগ, তা নয়। ব্যক্তিগতভাবেও প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তন তাকে ভয় দেখায় বলে জানান তিনি।
এর আগে জুলাই মাসে পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কি একটি আইনে স্বাক্ষর করেন। ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ওই আইনের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই আইন পোল্যান্ডে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় একটি জাতীয় কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। এই কর্তৃপক্ষ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যমান এআই-সংক্রান্ত নিয়মগুলো কার্যকর করতে পারবে।
এর মধ্যেই ওয়ারশর রাস্তায় রোবটদের এমন বিক্ষোভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার, কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ এবং প্রযুক্তির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার বিষয় সামনে এনেছে।