
আকস্মিক গ্যাস সংকট সামাল দিতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে সরকার। পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের সুবিধাজনক কোনো স্থানে টার্মিনালটি স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এর পাশাপাশি মহেশখালীর কুতুবজোমে আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে মহিলা আসন-১৭-এর সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদের লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আকস্মিক কিংবা সাময়িক গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাতে যেন সরবরাহে ঘাটতি তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যেই দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি আমদানির অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালু রয়েছে বলে জানান তিনি। এসব টার্মিনালের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব।
ভবিষ্যতে হঠাৎ গ্যাস সংকট দেখা দিলে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রমও বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আর মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এই সরবরাহ সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ভোলার গ্যাস শিল্পে সরবরাহের সম্ভাব্যতা যাচাই
এদিকে ভোলায় পাওয়া গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে এনে আগ্রহী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা যায় কি না, সেই সম্ভাবনাও যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্যাস পাওয়া সাপেক্ষে তা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরবরাহ করা হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড এবং বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
পাঁচ বছরে ১৫০ কূপ খননের পরিকল্পনা
দেশের নিজস্ব গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নতুন গ্যাসের উৎস চিহ্নিত ও অনুসন্ধানের লক্ষ্যে বড় পরিসরে সাইসমিক জরিপও পরিচালনা করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার এলাকায় ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হবে।
দেশীয় গ্যাসের মজুত ও নতুন উৎস অনুসন্ধানের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি সমুদ্রাঞ্চলেও তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সমুদ্রের ২৬ ব্লকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী জানান, সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে।
এতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিড দাখিলের শেষ সময় আগামী নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি–২০২৬’ প্রণয়নের কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, আকস্মিক গ্যাস সংকট মোকাবিলায় আমদানিনির্ভর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন ও অনুসন্ধান জোরদার করার দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। কুতুবজোম ও মাতারবাড়ীর নতুন টার্মিনাল, ভোলার গ্যাস শিল্পে সরবরাহের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনাকে এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।