
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের ট্যাগযুক্ত লাগেজ ও জমজমের পানি সময়মতো সরবরাহ করতে ব্যর্থতার ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ঘটনার সময় ব্যাগেজ এলাকার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
মদিনা থেকে ঢাকাগামী বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটের যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও লাগেজ ও জমজমের পানি না পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিমানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কন্টেইনার নামানো এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনায় গাফিলতির কারণে ব্যাগেজ বেল্টে সময়মতো জমজমের পানি পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
তিন ঘণ্টা পরও লাগেজ-পানি না পেয়ে ক্ষোভ
বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে মদিনা থেকে আসা বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটটি ঢাকায় অবতরণ করে। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও অনেক যাত্রী তাদের ট্যাগযুক্ত লাগেজ হাতে পাননি। একইভাবে উমরাহ যাত্রীরাও জমজমের পানি পাননি। অপেক্ষার সময় বাড়তে থাকায় যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
ফ্লাইটটির যাত্রীদের মধ্যে থাকা চার সংসদ সদস্য বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। তারা হলেন মেহেরপুর-১ আসনের মো. রাশেদুল ইসলাম রাসেল, ঢাকা-৫ আসনের মোহাম্মদ কামাল হোসেন, গাজীপুর-৪ আসনের সালাহউদ্দিন এবং খুলনা-২ আসনের জাহাঙ্গীর হুসাইন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ঢাকায় অবতরণের প্রায় তিন ঘণ্টা পরও ৩৫ জন সংসদ সদস্যসহ অধিকাংশ যাত্রী ট্যাগযুক্ত জমজমের পানি পাননি। কেন এত সময় ধরে পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না, সে বিষয়েও যাত্রীদের পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয়নি।
বিমান কর্তৃপক্ষকে ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য চার কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়। এরপরই গ্রাউন্ড সার্ভিসের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, প্রশ্নের মুখে ব্যাগেজ নিয়ন্ত্রণ
ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার মো. শাখাওয়াত হোসাইন খান (পি-৩৬৬৬৭), গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মনিরুজ্জামান প্রধান এবং গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার সাদ্দাম হোসেন। এর মধ্যে মনিরুজ্জামান প্রধান ও সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও শাখাওয়াত হোসাইন খান এখনো জবাবদিহির আওতায় আসেননি।
জানা গেছে, ঘটনার সময় শাখাওয়াত ব্যাগেজ এরিয়া কন্ট্রোলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দায়িত্বাধীন কন্টেইনারগুলোর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন, সব কন্টেইনার অফলোড করা হয়েছে। পরে একটি কন্টেইনার নিচে পড়ে থাকার বিষয়টি নজরে আসে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নজর এড়িয়ে ওই কন্টেইনার কীভাবে পড়ে রইল এবং ব্যাগেজ এরিয়া কন্ট্রোলার হিসেবে শাখাওয়াতের দেওয়া তথ্য কতটা সঠিক ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের পাশাপাশি ব্যাগেজ এলাকা নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকাও তদন্ত করা প্রয়োজন।
বিমানের গ্রাহকসেবা পরিচালক বদরুল হাসান লিটন বলেন, প্রাথমিকভাবে যাদের গাফিলতি বলে প্রতীয়মান হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অন্য কারও গাফিলতি বা অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও তিনি জানান।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার পর বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও আলোচনায় এসেছে। বিমানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানির ঘটনা নতুন নয়। অনেক সময় সরাসরি দায়ী ব্যক্তি বা যাদের গাফিলতির কারণে সমস্যা তৈরি হয়, তাদের পরিবর্তে হেলপার ও সাধারণ কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এতে সমস্যার মূল কারণ অমীমাংসিত থেকে যায়।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী ভোগান্তির অন্যতম কারণ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি। একাধিক সংস্থা একই সঙ্গে বিমানবন্দরের কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সবসময় থাকে না।
তিনি আরও বলেন, ট্রলি ব্যবস্থাপনা এবং কর্মীদের দায়িত্ব পালনের ঘাটতিও যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ায়। ফলে এ ধরনের ঘটনায় শুধু ব্যক্তিগত গাফিলতির দায় নির্ধারণ না করে পুরো ব্যবস্থাপনার কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।