
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিচালনার জন্য চারটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রস্তাব করেছে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেতে যাওয়া জাপানি কনসোর্টিয়াম। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একক আধিপত্যের বাইরে প্রতিযোগিতামূলক সেবা চালুর লক্ষ্যেই নতুন অপারেটর নিয়োগের এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট, তুরস্কের সেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিং, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডানাটা এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেনজিস এভিয়েশন।
ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ছাড়পত্র চেয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে তালিকা জমা দিয়েছে জাপানি কনসোর্টিয়াম। ছাড়পত্র পাওয়ার পর এই চার প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে একজনকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর হিসেবে বেছে নেওয়া হবে। এরপর নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেবে বেবিচক।
যাত্রীসেবায় নতুন অপারেটর, কার্গোর দায়িত্বে থাকছে বিমান
বেবিচকের সদস্য (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মাহবুব খান বলেন, চার প্রতিষ্ঠানের নাম জমা পড়েছে। বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাজ করার ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান কিংবা অন্য কোনো বিষয়ে আপত্তি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে।
তিনি জানান, নতুন অপারেটর নিয়োগের ফলে তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রী ব্যবস্থাপনার কাজে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি আরও একটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হবে। তবে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব বিমানের কাছেই থাকবে।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের আওতায় উড়োজাহাজের সেবা কার্যক্রম, যাত্রী ও লাগেজ ব্যবস্থাপনা, চেক-ইন, রানওয়ে-সংলগ্ন র্যাম্পে কার্যক্রম পরিচালনা এবং উড়োজাহাজের দ্রুত পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুতি নিশ্চিত করার মতো কাজ রয়েছে। এসব কার্যক্রম কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে, তার ওপর যাত্রীসেবার মান, ফ্লাইটের সময়ানুবর্তিতা এবং যাত্রীদের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা নির্ভর করে।
বিমান চলাচল খাতের বিশ্লেষকদের মতে, তৃতীয় টার্মিনালে অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত শুধু নতুন একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয় নয়। নির্মাণকাজ শেষে আন্তর্জাতিক মানের পরিচালনব্যবস্থা নিশ্চিত করাও বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। লাগেজ পেতে কত সময় লাগছে, চেক-ইন কত দ্রুত হচ্ছে, যাত্রীরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন কি না এবং ফ্লাইট বিপর্যয়ের সময় পরিস্থিতি কতটা কার্যকরভাবে সামাল দেওয়া হচ্ছে—এসব সূচকের মাধ্যমে সেবার মান যাচাই করা প্রয়োজন।
চার প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক কার্যক্রম ও সক্ষমতায় পার্থক্য
বেবিচকের নিরাপত্তা ছাড়পত্রের জন্য প্রস্তাবিত চার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের পরিধি, কর্মীসংখ্যা ও পরিচালন সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। পাওয়া তুলনামূলক তথ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক উপস্থিতি সম্পর্কে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা হলো—
সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট প্রায় ৪৪ থেকে ৪৯টি দেশে ৩১০টি বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৪৩ হাজার। বছরে প্রায় ৪০ লাখ ফ্লাইটের সেবায় যুক্ত থাকার পাশাপাশি প্রায় ৬২ লাখ টন কার্গো ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রয়েছে তাদের।
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডানাটা ৩৫টি দেশে ১৪৬টি বিমানবন্দর বা স্থাপনায় কার্যক্রম চালায়। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা ৫৫ হাজারের বেশি। বছরে ৮ লাখ ৮৮ হাজারেরও বেশি উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি প্রায় ৩২ লাখ টন কার্গো হ্যান্ডলিং করে প্রতিষ্ঠানটি।
তুরস্কের সেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিং পাঁচটি দেশের ৬০টির বেশি বিমানবন্দরে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা প্রায় ৯ হাজার।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেনজিস এভিয়েশন ৬৫টি দেশের ৩৪৭টি বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানিয়েছে। তাদের কর্মীসংখ্যা ৬৫ হাজারের বেশি এবং বছরে প্রায় ৫৩ লাখ ফ্লাইটের গ্রাউন্ড সার্ভিস দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে বলে প্রস্তাবিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব পরিসংখ্যান বিভিন্ন সময়ের হতে পারে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান সক্ষমতা তুলনা করার ক্ষেত্রে তথ্যের সময়কাল ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।
মেনজিসের অতীত অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্বজুড়ে কার্যক্রম থাকলেও মেনজিস এভিয়েশনের সেবার মান নিয়ে অতীতে সমালোচনা হয়েছে। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যের এডিনবরা বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটি সমালোচনার মুখে পড়ে। সে সময় কয়েক হাজার যাত্রীর লাগেজ আটকে থাকা, যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যর্থতা এবং অভিযোগ যথাযথভাবে নিষ্পত্তি না করার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক গ্রাহক পর্যালোচনা প্ল্যাটফর্ম ট্রাস্টপাইলটে প্রতিষ্ঠানটির রেটিং পাঁচের মধ্যে ১ দশমিক ৫ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে কয়েকজন যাত্রী কর্মীদের আচরণ, লাগেজ পেতে বিলম্ব এবং গ্রাহকসেবা নিয়ে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তবে অনলাইন পর্যালোচনা দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক সেবার মান চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
নিউজিল্যান্ডের প্রাথমিক শিল্প মন্ত্রণালয়ের (এমপিআই) তথ্য অনুযায়ী, দেশটির জীবসুরক্ষা-সংক্রান্ত আইন মেনে চলার নির্দেশনা লঙ্ঘনের ঘটনায় ২০২৫ সালে মেনজিস এভিয়েশন লিমিটেডকে দেড় লাখ নিউজিল্যান্ড ডলার জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত। অকল্যান্ড বিমানবন্দরে আমদানি করা পণ্যের ছয়টি চালান যথাযথভাবে মোড়কজাত না করা এবং পরিদর্শনকক্ষের স্বাস্থ্যবিধি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসংক্রান্ত ঘাটতির বিষয়টি আদালতের রায়ে উঠে আসে।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক, কর্মীসংখ্যা কিংবা অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করা ঠিক হবে না। নিরাপত্তাব্যবস্থা, লাগেজ সরবরাহের সময়, উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড, যাত্রীসেবার মান এবং অনিয়ম বা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতাও মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি অতীতের কার্যক্রম ও সেবার মান যাচাই করা প্রয়োজন।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, তৃতীয় টার্মিনালের জন্য অপারেটর বাছাইয়ের সময় প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক, কর্মীসংখ্যা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তাদের অতীত সেবার মান, নিরাপত্তাব্যবস্থা, লাগেজ ব্যবস্থাপনা এবং উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ডে দক্ষতা বিবেচনায় নিতে হবে।
তাঁর মতে, আন্তর্জাতিকভাবে বড় প্রতিষ্ঠান হলেই সব বিমানবন্দরে একই মানের সেবা নিশ্চিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই অপারেটর নিয়োগের পাশাপাশি সেবার মান যাচাইয়ের নির্দিষ্ট সূচক নির্ধারণ, নিয়মিত তদারকি এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।