
স্বাধীনতার ঘোষণা ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনার মধ্যেই পাকিস্তানের অশান্ত বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর এক রক্তক্ষয়ী ও ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। মাসতুং এলাকার কাছে সেনাবাহিনীর একটি সুরক্ষিত বহরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অতর্কিত হামলায় অন্তত ৪৫ জন পাকিস্তানি সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম 'বেলুচিস্তান পোস্ট'-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
নিষিদ্ধ ঘোষিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) ইতিমধ্যেই এই কাপুরুষোচিত হামলার দায় স্বীকার করেছে। গত দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে বেলুচিস্তানে দেশটির নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীর ওপর এটি তৃতীয় বড় ধরনের ও সুপরিকল্পিত হামলা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করা হলেও সরকারিভাবে এখনো সুনির্দিষ্ট নিহতের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
মুখোমুখি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও সেনা অভিযান
হামলার বিষয়ে বিএলএ-এর মুখপাত্র জিয়ান্দ বালুচ গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, তাঁদের যোদ্ধারা প্রথমে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর মূল বহর, এরপর বহরের পাহারাদার দল এবং পরবর্তীতে হামলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসা অতিরিক্ত সেনা দলকে লক্ষ্য করে পর্যায়ক্রমে এই হামলাটি চালিয়েছে।
বিবৃতিটি গণমাধ্যমে দেওয়ার সময়ও বিএলএ যোদ্ধা ও পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে তীব্র বন্দুকযুদ্ধ চলছিল উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা সামনে আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।
এর আগে চলতি সপ্তাহেই জিয়ারত জেলার মাঙ্গি ড্যাম এলাকায় ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং লাসবোলায় ১১ জন পাকিস্তানি সেনার নৃশংস মৃত্যুর জেরে বেলুচিস্তানজুড়ে ‘অপারেশন শাবান’ নামক এক বিশাল সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এই বিশেষ অভিযানে সেনাবাহিনী, ফ্রন্টিয়ার কোর, বেলুচিস্তান পুলিশ, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও বিমানবাহিনী যৌথভাবে অংশ নিয়েছে।
দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী হুঙ্কার দিয়ে জানান, এই জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে। একই সাথে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন:
‘সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, তা সন্ত্রাসীরা কল্পনাও করতে পারবে না।’
স্বাধীনতার ঘোষণা ও ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
পাকিস্তানের ভৌগোলিক আয়তনের দিক থেকে বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই স্বাধিকার ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। এর মধ্যেই গত বুধবার নিজেকে বেলুচিস্তানের মুখপাত্র হিসেবে দাবি করে মীর ইয়ার বালুচ নামের এক ব্যক্তি নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে ঘোষণা দেন যে, বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে পৃথক হয়ে নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। ওই পোস্টে আরও দাবি করা হয়, ‘রিপাবলিক অফ বেলুচিস্তান’-এর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনী ইতিমধ্যে বেলুচিস্তানের ৮৫ শতাংশ এলাকার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এমনকি তারা নিজেদের জাতীয় সঙ্গীত ‘মা চুকাইন বালুচানি’, জাতীয় পতাকা এবং ‘বালুচি ফালুস’ নামক নিজস্ব মুদ্রার প্রচলনও শুরু করে দিয়েছে।
ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এই প্রদেশটির কৌশলগত ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব অপরিসীম। চীনের শত কোটি ডলার বিনিয়োগে নির্মিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অন্যতম প্রধান স্তম্ভ গভীর সমুদ্রবন্দর 'গদর' এই বেলুচিস্তানেই অবস্থিত।
একের পর এক রক্তক্ষয়ী হামলার ইতিহাস
চলতি মাসের ৬ থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে প্রদেশটিতে আরও দুটি বড় হামলার ঘটনা ঘটে, যার একটির নেপথ্যে ছিল বিএলএ এবং অন্য দুটির পেছনে ছিল তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। গত ৭ জুলাই টিটিপির হামলায় এক ভয়ানক জিম্মি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র চৌধুরী রাওয়ালপিন্ডিতে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, একটি চেকপোস্ট নিজেদের দখলে নেওয়ার পর টিটিপি জঙ্গিরা সেখান থেকে বেঁচে যাওয়া ১৮ জন পুলিশ সদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে তাঁদের সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর এটি অন্যতম বর্বর হামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এরপর গত ৮ জুলাই লাসবোলা জেলার বেলা-উইন্ডার এলাকার কাছে এন-২৫ মহাসড়কে আরেকটি সেনা বহরে হামলা চালায় সশস্ত্র জঙ্গিরা। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই হামলার জন্য বিএলএকে দায়ী করে জানায়, এতে একজন জুনিয়র কমিশনড অফিসারসহ ১১ জন সেনা নিহত হয়েছেন। তবে বিএলএ-এর দাবি ছিল, তারা ১৭ জন সেনাকে হত্যা করেছে এবং তাদের সমস্ত আধুনিক অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম নিজেদের দখলে নিয়েছে। অবশ্য বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এই দাবির সত্যতা স্বাধীন কোনো সূত্র থেকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।