
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগের পাশাপাশি অর্থনীতিকে গতিশীল করতে চীনের বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারে সক্রিয় হয়েছে বাংলাদেশের নতুন সরকার। গত মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন, যা দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন কৌশলগত দিকনির্দেশনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সরকারপ্রধানদের ক্ষেত্রে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরের গন্তব্য সাধারণত ভারত হলেও তারেক রহমানের চীন সফর দিল্লির প্রতি একটি পরোক্ষ বার্তা বহন করে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ার পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটে বেইজিং সফর বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। সফরে মোংলা বন্দরের কাছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা এবং তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের কারিগরি সহযোগিতার বিষয়টি ভারতের নীতিনির্ধারকদের বিশেষ নজরে রয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নিরঙ্কুশ জয়ের পর তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে দুই দেশের সম্পর্কে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শ্যাম শরণ বিবিসিকে জানিয়েছেন, সীমান্তভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার পথে এবং ভারত আবারও বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা দেওয়া শুরু করেছে।
এ ছাড়া প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর কলকাতা-ঢাকা ও ঢাকা-আগরতলা রুটে সীমিত পরিসরে যাত্রীবাহী বাস চলাচল পুনরায় চালু হয়েছে। বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সময় ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে জরুরি জ্বালানি সরবরাহ করে। পাশাপাশি ঢাকায় নিযুক্ত নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদিকে ক্যাবিনেট পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়াও ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে সম্পর্ক উন্নয়নের এসব উদ্যোগের মধ্যেও কয়েকটি সংবেদনশীল ইস্যু অমীমাংসিত রয়েছে। শেখ হাসিনাকে ভারতের অব্যাহত আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশে ভারতবিরোধী জনমত তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধ অভিবাসনের অভিযোগে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কথিত ‘পুশ-ইন’ কার্যক্রমও ঢাকার অসন্তোষ বাড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বিজয়ের পর এর সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও বাংলাদেশে আলোচনা চলছে। সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবিরের মতে, এসব বিষয় বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলছে।
ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের একটি হলো তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা। বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির মধ্যে ঢাকা ও বেইজিং নদী ব্যবস্থাপনায় যৌথ কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে একমত হয়েছে। ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিকটবর্তী এলাকায় চীনের উপস্থিতির সম্ভাবনাকে দিল্লি কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তবে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের দাবি, ভারতকে আগে এই প্রকল্পে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় নিয়েছে। অন্যদিকে, চীনের বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে।
এদিকে ভারতের উদ্বেগ কমাতে চীনও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়া কুন বলেন, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটি বাইরের প্রভাবমুক্ত থাকা উচিত। বর্তমানে বাংলাদেশে সামরিক সরঞ্জামের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী দেশ চীন। পাশাপাশি ঢাকার কাছে বেইজিংয়ের ঋণের পরিমাণ ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। সফরকালে চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে যুক্ত করে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক করিডোর গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছে বেইজিং।
অন্যদিকে, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। তাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ। গত বছর ছাত্র আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শ্যাম শরণ মনে করেন, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য রাজনৈতিকভাবে ভারত সফর কিছুটা জটিল হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ—উভয় দেশের জন্যই পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। ফলে কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যেও ঢাকা ও দিল্লিকে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখেই এগোতে হবে।