
দীর্ঘ রাজনৈতিক অপেক্ষার পর সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। দুই শতাধিক আসনে নিরঙ্কুশ জয় নিশ্চিত করার পর নতুন প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা ঘিরে চলছে জোর প্রস্তুতি। হবু মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য ইতোমধ্যে ৪০টি সরকারি বাসভবন প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং অর্ধশত বিলাসবহুল গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, নতুন প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য বাসভবন হিসেবে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’কে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এটি শিগগিরই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নতুন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকেই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় সেখানে সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। একই স্থানে বিকেল ৪টায় নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেবেন।
ঢাকার বেইলি রোড, গুলশান, ধানমন্ডি ও মিন্টো রোড এলাকায় মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য প্রায় ৪০টি বাসভবন প্রস্তুত রয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান উপদেষ্টারা যেসব সরকারি বাসভবন ছেড়ে দিয়েছেন, সেগুলো এখন বসবাসের উপযোগী অবস্থায় আছে। যদিও বর্তমানে ৪০টি বাড়ি প্রস্তুত, তবে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বাসভবন প্রস্তুত করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “মন্ত্রীদের এখনই ওঠার মতো প্রায় ৪০টি সরকারি বাসভবন আছে। এগুলো আগের মন্ত্রীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা কয়েকটি বাড়ি ব্যবহার করেছেন, আবার অনেকগুলো বর্তমানে ফাঁকা আছে। মন্ত্রীদের আবাসন নিয়ে আপাতত কোনো সমস্যা হবে না।”
তিনি আরও জানান, যেসব বাড়িতে সংস্কার প্রয়োজন, সেখানে দ্রুত কাজ শুরু হবে। এর মধ্যে হাইজেনিক ওয়াশ, বাথরুমের ফিটিংস পরিবর্তন এবং রং করার কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
নতুন প্রধানমন্ত্রীর আবাসন এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন একই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বর্তমান বাসভবন ‘যমুনা’ প্রাথমিকভাবে বিবেচনায় আছে। পাশাপাশি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন একীভূত করে প্রধানমন্ত্রীর স্থায়ী বাসভবন নির্ধারণের বিষয়ে পূর্ববর্তী একটি কমিটির সুপারিশ থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর আবাসনের বিষয়ে আগাম কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি নেই। তিনি কোথায় থাকবেন, তা সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। বর্তমানে তাৎক্ষণিক ব্যবহারের উপযোগী হিসেবে একমাত্র ‘যমুনা’ প্রস্তুত আছে। তিনি যদি সেখানে থাকার সিদ্ধান্ত নেন, তবে আমাদের চূড়ান্ত প্রস্তুতির কাজ শুরু হবে। তবে তিনি চাইলে নিজের বর্তমান বাসভবনেও থাকতে পারেন অথবা নতুন কোনো বাসভবন তৈরির নির্দেশনাও দিতে পারেন।”
তিনি আরও বলেন, “স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাংলো একীভূত করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন তৈরি করার বিষয়ে আগে একটি কমিটির সুপারিশ থাকলেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় জড়িত। ওটা করলে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার কোথায় থাকবেন? তাছাড়া সেটি জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে অবস্থিত। তাই নতুন সরকার গঠন পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। এরপরই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
এদিকে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক গাড়ি প্রস্তুত রাখার নির্দেশনার ভিত্তিতে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর প্রাথমিকভাবে ৫০টি গাড়ি প্রস্তুত করেছে। ভিভিআইপি প্রটোকল অনুযায়ী অতিরিক্ত কয়েকটি গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়, যাতে কোনো গাড়ি বিকল বা দুর্ঘটনায় পড়লে তাৎক্ষণিক বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এ কারণেই প্রয়োজনীয় সংখ্যার সঙ্গে অতিরিক্ত পাঁচটিসহ মোট ৫০টি গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন মন্ত্রিসভার আকার নির্ধারণ করবেন প্রধানমন্ত্রী। শপথের আগে চাহিদা জানানো হলে সেই অনুযায়ী গাড়ি সরবরাহ করা হবে। আপাতত আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় যানবাহন প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।
সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের পরিবহন কমিশনার মো. খায়রুল কবীর মেনন বলেন, “মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা প্রয়োজনীয় সংখ্যক গাড়ি প্রস্তুত রাখছি। তবে ঠিক কতগুলো গাড়ি লাগবে, সেটি শপথের দিন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে চূড়ান্তভাবে জানানো হবে। সেই অনুযায়ী আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে সেখানে ভোট স্থগিত করা হয়। প্রায় দুই যুগ পর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের পথে বিএনপি। দলটির পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, চেয়ারম্যান তারেক রহমানই দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। তিনি ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে উভয় আসনেই জয়লাভ করেছেন। তার নেতৃত্বে দলটি চতুর্থবারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে।