
বিশ্বের বুকে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার মহান ব্রত নিয়ে সুদূর সুদানে দায়িত্ব পালনকালে শহীদ হওয়া বাংলাদেশের ছয় সাহসী শান্তিরক্ষীকে মরণোত্তর সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত করেছে জাতিসংঘ। স্থানীয় সময় গতকাল শুক্রবার (৬ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে জাঁকজমকপূর্ণ এক অনুষ্ঠানে তাঁদের এই বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।
জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গকারী এই ৬ বীরের মরণোত্তর ‘দাগ হ্যামারশোল্ড’ পদক জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরীর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেন। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই শান্তিরক্ষীদের অসীম সাহসিকতা, নজিরবিহীন আত্মত্যাগ ও অনন্য দায়িত্বনিষ্ঠার চিরন্তন স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা দেওয়া হলো।
জাতিসংঘের সর্বোচ্চ সম্মাননা লাভ করা বাংলাদেশের এই ৬ বীর সন্তান হলেন—করপোরাল মো. মাসুদ রানা, প্রাইভেট মো. জাহাঙ্গীর আলম, প্রাইভেট মো. সবুজ মিয়া, প্রাইভেট মো. মোমিনুল ইসলাম, প্রাইভেট শামীম রেজা এবং প্রাইভেট সান্তো মন্ডল। উল্লেখ্য, সুদানের কাদুগলিতে জাতিসংঘের আবেই অঞ্চলের অন্তর্বর্তীকালীন নিরাপত্তা বাহিনীতে (UNISFA) কর্মরত থাকা অবস্থায় গত ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর এক অতর্কিত ও নৃশংস ড্রোন হামলায় তাঁরা শাহাদাতবরণ করেন।
স্মরণসভার এই বিশেষ অনুষ্ঠানে ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনে প্রাণ হারানো প্রায় ৪ হাজার ৫০০ জন বীর শান্তিরক্ষীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এর পাশাপাশি বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ ও সংঘাতময় মিশনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কর্মরত ৫০ হাজারের বেশি শান্তিরক্ষীর মানবিক অবদানের কথা সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
চলতি বছর বিশ্বের ৩৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মোট ৬৮ জন সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক বীর শান্তিরক্ষীকে মরণোত্তর ‘দাগ হ্যামারশোল্ড’ পদকে ভূষিত করেছে জাতিসংঘ। সম্মাননা প্রদান পর্বের সমাপনীতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরী দেশের এই শহীদ বীরদের স্মরণে উন্মুক্ত করা শোক বইতে স্বাক্ষর করেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, জাতিসংঘের দ্বিতীয় মহাসচিবের স্মরণে ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এই ‘দাগ হ্যামারশোল্ড’ পদক প্রবর্তন করে। বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনকালে যেসকল সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁদের অবিস্মরণীয় অবদান ও চূড়ান্ত আত্মত্যাগকে চিরকাল অম্লান রাখতেই এই মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া হয়ে থাকে।