
মাদক নির্মূলের কার্যক্রম সফল করতে হলে প্রথমে পুলিশ বাহিনীর ভেতর থেকে মাদকসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে মাদক কারবার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতে হবে সাধারণ মানুষকে। এমন মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।
আজ রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে বাগেরহাট পুলিশ লাইনসের মিলনায়তনে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, কিশোর গ্যাং ও উগ্রবাদবিরোধী কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইজিপি জানান, গত দুই মাসে মাদকসংশ্লিষ্টতার কারণে ২৭ জন পুলিশ সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গত দুই মাসে আমি মাদকের কারণে ২৭ জন পুলিশ সদস্যকে জেলে পাঠিয়েছি। আগে ঘর পরিষ্কার হোক, তারপরে আপনারা পরিষ্কার হবেন।’
মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশি তৎপরতা বাড়াতে এ-সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে বাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গত ১৭ বছরে মাদকের বিস্তার, বললেন আইজিপি
দেশে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, গত ১৭ বছরে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন এলাকায় মাদকের আস্তানা গড়ে উঠেছে। এখন এসব নির্মূলের দায়িত্ব কার—সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, মাদক নির্মূলে পুলিশ ও জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
পুলিশের জনবল সংকটের কথাও তুলে ধরেন বাহিনীর প্রধান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে পুলিশের সদস্যসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার। চলতি বছর আরও ২০ হাজার সদস্য নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এত বিপুলসংখ্যক সদস্যকে একই সময়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। এ কারণে নতুন প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দেশের উন্নয়নের জন্য কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই। সরকারকে সবাই মিলে সহযোগিতা না করলে অগ্রগতি সম্ভব হবে না। শান্তি, সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কিশোর গ্যাং দমনে বিশেষ কমিটি
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ঠেকাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান আইজিপি। জেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এসব কমিটি কাজ করবে।
তিনি বলেন, স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের এলাকার কিশোরদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানেন। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য কাজে লাগিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় দক্ষ একটি সাইবার ইউনিট গঠনের কথাও জানান পুলিশপ্রধান। তাঁর ভাষ্য, গুজব ছড়ানো ও সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতা বা মব ঠেকাতে এ ইউনিট কাজ করবে।
বেকারত্বকে অপরাধে জড়ানোর কারণ বললেন আইজিপি
তরুণদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে বেকারত্বের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, প্রতিবছর দেশে ২৭ লাখ বেকার যুক্ত হচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি হলেও তাঁদের কর্মক্ষমতা যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করছেন না; অনেকে ব্যাংকে টাকা জমা রাখছেন। বিনিয়োগ না বাড়লে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে না।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে আইজিপি বলেন, ‘গুজব, আপা আসবে, কে আসবে আর না আসবে, তা নিয়ে আমাদের প্রশাসনের, কমিউনিটি পুলিশের কোনো ভাবনা নেই।’
সমাবেশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. জামিলুর ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন খুলনা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. রেজাউল করিম, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, সরকারি পিসি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক পারভীন আক্তার, বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু সাইদ শুনু এবং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতা প্রদীপ বসু শন্তুসহ জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সমাবেশে অংশ নেওয়া নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, কিশোর গ্যাং ও উগ্রবাদ প্রতিরোধে সমন্বিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।