
উন্নত জীবনের হাতছানিতে ঘর ছেড়েছিলেন সংসারের বড় ছেলে। কিন্তু দালালের খপ্পরে পড়ে ইউরোপের পরিবর্তে ঠিকানা হয়েছিল রাশিয়ার রণক্ষেত্রে। অবশেষে ইউক্রেন ফ্রন্টলাইনে মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারাতে হলো মাদারীপুরের যুবক সুরুজ কাজীকে (৩৫)। বৃহস্পতিবার (২১ মে) সন্ধ্যায় সুদূর রাশিয়া থেকে আসা একটি ফোন কলে সুরুজের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয় তাঁর পরিবার।
নিহত সুরুজ কাজী মাদারীপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ খাগড়াছড়া গ্রামের শাহাবুদ্দিন কাজীর সন্তান। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে পরিবার ও প্রতিবেশীদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
ভালো থাকার খোঁজে যেভাবে যুদ্ধের ময়দানে
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, অর্থনৈতিক সচ্ছলতার আশায় বাংলাদেশি এক মানব পাচারকারীর মাধ্যমে প্রথমে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন সুরুজ। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও ইউরোপের ভিসা পেতে ব্যর্থ হয়ে তিনি একটি এজেন্সির মাধ্যমে বিকল্প হিসেবে রাশিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আজ থেকে প্রায় আট মাস আগে তিনি বাংলাদেশ ছাড়েন।
সেখানে কোনো সাধারণ বা বাণিজ্যিক কর্মসংস্থানে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর স্থানীয় দালাল চক্রের বলী হয়ে তিনি রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হন। সম্প্রতি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নিতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে সুরুজের মৃত্যু হয়। শুরুতে রুশ কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্টরা এই মৃত্যুর খবরটি চেপে রাখলেও, সেখানে অবস্থানরত দুই বাংলাদেশি প্রবাসী যুবক মুঠোফোনের মাধ্যমে সুরুজের দেশের বাড়িতে মৃত্যুর খবরটি জানান।
পরিবারে চলছে শোকের মাতম
তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সুরুজ ছিলেন সবার বড়। সংসারের মূল চালিকাশক্তি ও জ্যেষ্ঠ সন্তানকে হারিয়ে পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বাবা শাহাবুদ্দিন কাজী। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার বড় ছেলে আর নাই। এই কথা শোনার থিকা আল্লায় আমারে নিয়া গেলে ভালো হইতো। হায়রে দুনিয়া। বিদাশে গেল ভালো থাকার লিগা, এখন সব শেষ হইয়া গেল। শেষবারের মতো ছেলের মুখটা একবার দেখতে চাই। সরকারের কাছে দাবি, আমার ছেলের লাশটা যেন দেশে এনে দেন এবং আমাদের পরিবারের জন্য সাহায্য সহযোগিতা করেন।’
নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে মাত্র তিন মাস আগেই সুরুজের দুই বছরের একমাত্র পুত্রসন্তান ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। সন্তান শোকের পর এবার স্বামীকে হারিয়ে পুরোপুরি দিশেহারা ২২ বছর বয়সী স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। তিনি বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘আমার স্বামীও নাই, সন্তানও নাই। কারে আগলাই বাঁচুম আমি। কে দেখবো আমারে? আল্লাহ গো তুমি আমারেও লইয়া যাও।’
নিহত সুরুজের নিকটাত্মীয় রহমত মিয়া গভীর ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘সংসারের হাল ধরতে বিদেশে গিয়েছিল সুরুজ। কে জানত যুদ্ধেই তার প্রাণ চলে যাবে। তার এমন মৃত্যু আমরা কোনোভাবেই মানতে পারছি না। আমরা তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই।’
প্রশাসন ও পুলিশের বক্তব্য
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব আশ্বাস দিয়ে জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করা হলে মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারিভাবে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে। এছাড়াও এই কঠিন সময়ে উপজেলা প্রশাসন সবসময় শোকাহত পরিবারটির পাশে থাকবে।
অন্যদিকে মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মাদারীপুরের এক যুবকের মৃত্যুর খবর স্বজনদের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি। তিনি কীভাবে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন, সে তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে তাঁর পরিবার এ ঘটনায় কোনো অভিযোগ দায়ের করলে আমরা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’