
নীলফামারীর সৈয়দপুরে পেট্রোল ঢেলে ঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনায় দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক বৃদ্ধের করুণ মৃত্যুর পর উত্তাল হয়ে উঠেছে গোটা এলাকা। ঘটনার তিন দিন পার হলেও পুলিশ মামলা গ্রহণ না করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে নিহতের মরদেহ বুকে নিয়ে থানা ঘেরাও, বিক্ষোভ মিছিল এবং প্রধান সড়ক অবরোধ করেছেন নিহতের পরিবার ও বিক্ষুব্ধ শত শত গ্রামবাসী। ভুক্তভোগীদের গুরুতর অভিযোগ, পুলিশ মামলা নিতে শুধু টালবাহানাই করেনি, বরং লাখ টাকার বিনিময়ে পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে আপস-মীমাংসার জন্য অনবরত চাপ সৃষ্টি করে আসছিল।
আজ সোমবার (৮ জুন) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের কাচারীপাড়া এলাকা থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে এক অভাবনীয় বিক্ষোভের সৃষ্টি করেন শতাধিক মানুষ। তাঁরা নিহত বৃদ্ধের মরদেহবাহী গাড়ি সাথে নিয়ে সৈয়দপুর শহরে প্রবেশ করেন। এরপর এক বিশাল প্রতিবাদী মিছিল শেষে বিক্ষুব্ধ জনতা সরাসরি সৈয়দপুর থানার প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন এবং গুরুত্বপূর্ণ শেরে বাংলা সড়কটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলেন।
এর ফলে সৈয়দপুর-নীলফামারী মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল একদম স্থবির হয়ে পড়ে এবং সড়কের দুপাশে শত শত গাড়ি আটকা পড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় থানা এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রায় দুই ঘণ্টা পর পুলিশ বাধ্য হয়ে এজাহারটি সরকারি খাতায় নথিভুক্ত (মামলা হিসেবে গ্রহণ) করলেও ক্ষুব্ধ জনতা তাদের অবরোধ তুলে নিতে অস্বীকৃতি জানান।
বিক্ষোভকারীরা উল্টো সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার ও অপসারণের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। টানা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে থানা চত্বর এবং এর আশেপাশের পুরো এলাকা এই নজিরবিহীন প্রতিবাদের কারণে অবরুদ্ধ ও থমথমে অবস্থায় থাকে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার ভোররাত ৪টার দিকে উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাচারীপাড়ায় আফাজ উদ্দিনের (৬২) বড় ছেলে নূর হোসেনের একটি নতুন নির্মাণাধীন বাড়িতে দুর্বৃত্তরা পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তবে ভাগ্যবশত ঘটনার সময় নূর হোসেন সেই ঘরে না থেকে তাঁদের পুরোনো বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু ওই রাতে ভবনে ঘুমিয়ে থাকা তাঁর বৃদ্ধ বাবা আফাজ উদ্দিন আগুনের লেলিহান শিখায় মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে তাঁকে সৈয়দপুর ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং সেখান থেকে একই দিন উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে টানা চার দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে গত শনিবার দুপুর ১টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
নিহতের ছোট ছেলে আবু বকর সিদ্দিক তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন যে, প্রায় পাঁচ মাস আগে স্রেফ গাছের ঝরা পাতা কুড়ানোকে কেন্দ্র করে একই ইউনিয়নের মাঝাপাড়া এলাকার আব্দুল জব্বারের ছেলে আব্দুস সালাম চঞ্চলের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের একটি বিরোধের সূত্রপাত হয়। ওই সময় চঞ্চল তাঁর বড় ভাইকে প্রকাশ্য মারধর করে এবং হাতের মোবাইল ফোনটি ভেঙে ফেলেছিল।
তিনি দাবি করেন, সেই পুরোনো শত্রুতার জের ধরেই গত ৩ জুন রাতে তারাগঞ্জ বাজারে তাঁর বড় ভাইকে আটকে রেখে পুনরায় মারধর করা হয়। পরবর্তীতে সেই ক্ষোভ থেকে প্রতিশোধ নিতে চঞ্চল ও তার পরিবারের সদস্যরা নূর হোসেনকে পুড়িয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে ওই নির্মাণাধীন ঘরে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। কিন্তু ঘটনাক্রমে ভাই সেখানে না থাকায় বৃদ্ধ বাবা এই নৃশংস ও বর্বরোচিত হামলার শিকার হন।
আবু বকর সিদ্দিক আরও বলেন, “বাবা ঢাকার বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। আমরা থানায় অভিযোগ দিলেও তিন দিনেও মামলা নেওয়া হয়নি। উল্টো ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। বাধ্য হয়েই আমরা লাশ নিয়ে থানায় এসেছি। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
মামলা নিতে বিলম্ব ও আপসের চাপের বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম রেজা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “ঘটনার পরপরই পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তদন্ত করেছে। তবে আহত ব্যক্তির চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ লিখিত অভিযোগ দিতে আসেননি। পরে একটি এজাহার জমা দেওয়া হলেও তাতে কিছু ত্রুটি থাকায় সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়।”
তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে আরও বলেন, “পুলিশ নিজেরাই এজাহার সংশোধন করে দিতে চাইলেও তারা রাজি হয়নি। সোমবার সকালে আসতে বললেও তারা লাশ ও লোকজন নিয়ে থানায় এসে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে। ইতোমধ্যে মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
অন্যদিকে, অভিযুক্ত পক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা সব ধরনের দায় অস্বীকার করে দাবি করেছে যে, পূর্বশত্রুতার জেরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে এই মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার চক্রান্ত চলছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই এবং এর সাথে তাদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে এবং নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হলেই প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।