
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই ‘মানবিক’ উদ্যোগ হিসেবে দুই হাজারেরও বেশি বন্দিকে মুক্তি দিতে যাচ্ছে কিউবা সরকার। ইস্টারের পবিত্র সপ্তাহকে ঘিরে ২,০১০ জন দণ্ডপ্রাপ্তকে ক্ষমা করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। তবে মানবিক উদ্যোগ হিসেবে এসব বন্দিদের মুক্তির সিদ্ধান্ত নিলেও বিশ্লেষকদের ধারণা, অব্যাহত মার্কিন চাপের মুখে কিউবা সরকার এই বন্দি মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (০২ এপ্রিল) কিউবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গ্রানমায় প্রকাশিত এ ঘোষণাটি চলতি বছরে দ্বিতীয় দফা বন্দিদের প্রতি রাষ্ট্রীয় ক্ষমা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে চলমান আলোচনার প্রেক্ষাপটে এসেছে। এর আগে মার্চ মাসে কয়েক ডজন বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
গ্রানমা জানিয়েছে, “দণ্ডিতদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ, কারাগারে তাদের ভালো আচরণ, তাদের সাজার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভোগ করা এবং তাদের স্বাস্থ্যের অবস্থার সতর্ক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
যদিও হাভানা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, তবুও এই ঘোষণার সময়টি এমন এক প্রেক্ষাপটে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন কিউবার ওপর কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠোর চাপ প্রয়োগ করছে।
এদিকে, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত কিউবার শীর্ষ কূটনীতিক সম্প্রতি দেশটির ভেঙে পড়া অর্থনীতি পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও এই আলোচনার এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন কিউবায় সরকার পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে আসছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট দ্বীপটি ‘দখল’ করার বিষয়েও ভাবছেন বলে জানা গেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিউবান স্টাডিজ বিভাগের প্রধান মাইকেল বুস্তামান্তে এএফপিকে বলেন, “এটা ভাবা অমূলক নয় যে, এটি উভয় সরকারের মধ্যে আলোচনার অগ্রগতির একটি লক্ষণ। হয়তো ধীরে, কিন্তু অগ্রসর হচ্ছে। কোন দিকে? তা স্পষ্ট নয়,”
তিনি আরও বলেন, “আমি মনে করি, এর সম্ভাব্য রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝার জন্য এই মুক্তিগুলোতে কারা অন্তর্ভুক্ত আছেন, সেটাও আমাদের দেখতে হবে।”
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই কিউবায় রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে। তবে কিউবান সরকার এখনো ক্ষমাপ্রাপ্তদের নাম, অপরাধের ধরন কিংবা মুক্তির নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করেনি।
সরকার জানিয়েছে, মুক্তির আওতায় তরুণ, নারী এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী বন্দিরা রয়েছেন, যাদের আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে আগাম মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে ১২ মার্চ সরকার ঘোষণা দেয়, ভ্যাটিকানের প্রতি “সদিচ্ছার” নিদর্শন হিসেবে ৫১ জন বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হবে। পরদিন প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয় জানিয়েছে, ২০১১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ দফায় মোট ১১,০০০-এর বেশি বন্দিকে ক্ষমা করা হয়েছে। তারা উল্লেখ করে, “পবিত্র সপ্তাহের ধর্মীয় উৎসবের প্রেক্ষাপটে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত আমাদের বিচার ব্যবস্থার ঐতিহ্য এবং বিপ্লবের মানবিক উত্তরাধিকারের প্রতিফলন।”
এছাড়া ক্ষমাপ্রাপ্তদের মধ্যে বিদেশি নাগরিক ও প্রবাসী কিউবানরাও রয়েছেন। তবে হত্যা, যৌন নিপীড়ন, মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধ, চুরি, অবৈধ পশু জবাই এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের এই তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে।
ঘোষণাটি এমন সময় এলো, যখন রাশিয়া জানিয়েছে— যুক্তরাষ্ট্রের আংশিক তেল অবরোধ শিথিল করার পর তারা কিউবায় দ্বিতীয় দফায় তেলবাহী জাহাজ পাঠাতে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বুস্তামান্তে বলেন, “ট্রাম্প প্রশাসনের একটি রুশ জাহাজকে... এবং সম্ভবত আরও একটিকে দেশে ঢুকতে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সে বিষয়ে উপসংহারে আসা বা প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক।”
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি বলেন, “তাদের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন না করলে তাদের অর্থনীতি ঠিক করা যাবে না,” এবং যোগ করেন, “কিন্তু তারা যে অনেক বড় সমস্যায় আছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই, এবং এ বিষয়ে আমরা খুব শীঘ্রই আরও খবর পাব।”
সূত্র: আল জাজিরা