
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাম্প্রতিক এক হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ একটি রাডার ধ্বংস করেছে বলে দাবি উঠেছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
থাড ব্যবস্থা: কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি থাড ব্যবস্থাটি মূলত বায়ুমণ্ডলের সীমানায় থাকা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে চিহ্নিত ও ধ্বংস করার জন্য নকশা করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র হলো এর অত্যন্ত শক্তিশালী রাডার, যার মূল্য প্রায় ত্রিশ কোটি মার্কিন ডলার। সম্পূর্ণ একটি থাড ব্যাটারির মূল্য প্রায় একশ কোটি ডলার।
এই ব্যবস্থাটি মূলত দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও ধ্বংস করার জন্য তৈরি। এর শক্তিশালী রাডার বহুদূর থেকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তুর দিকে পরিচালিত করে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি থাড রাডারের মূল্য প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলার এবং একটি পূর্ণাঙ্গ থাড ব্যাটারির মূল্য প্রায় ১০০ কোটি ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের রাডার ধ্বংস হওয়া মানে নির্দিষ্ট একটি এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার “চোখ” অন্ধ হয়ে যাওয়া। ফলে ওই অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন সেনা ও তাদের মিত্রদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার স্নায়ুকেন্দ্র: এই রাডারটি বহুদূর থেকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে এবং সেগুলোকে আকাশেই ধ্বংস করার জন্য প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুর দিকে পরিচালিত করে।
অপরিবর্তনযোগ্য সম্পদ: এটি এমন কোনো যন্ত্রাংশ নয় যা রাতারাতি বদলে ফেলা যায়। কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের মতে, পুরো বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র আটটি থাড ব্যাটারি রয়েছে। ফলে এর ক্ষতিপূরণ করা অত্যন্ত কঠিন।
“থাড রাডারে সফল আঘাত ইরানের এযাবৎকালের সবচেয়ে সফল সামরিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে একটি। এটি একটি দুষ্প্রাপ্য কৌশলগত সম্পদ, এবং এর ধ্বংস হওয়াটা মার্কিন বাহিনীর জন্য একটি বিশাল ধাক্কা।” সামরিক বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে ব্লুমবার্গ সংবাদমাধ্যম।
কৌশলগত প্রভাব: প্রতিরক্ষা জালে ফাটল
এই রাডারটি ধ্বংস হওয়ার অর্থ হলো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর “চোখ” অন্ধ হয়ে যাওয়া। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে:
১. প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার উপর চাপ বৃদ্ধি: থাড রাডার অকেজো হওয়ার কারণে, এখন ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর মূল দায়িত্ব এসে পড়েছে স্বল্প-পাল্লার প্যাট্রিয়ট নামক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার উপর।
২. প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র সংকট: প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ইতিমধ্যেই তলানিতে এসে ঠেকেছে। নতুন করে এত বড় চাপ সামলানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
৩. আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য হুমকি: রাডার ধ্বংসের ফলে সৃষ্ট নজরদারির ঘাটতি পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনা এবং তাদের মিত্রদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
দুই হাজার ছাব্বিশ সালের আঠাশে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে “অপারেশন এপিক ফিউরি” শুরু করে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব, পারমাণবিক স্থাপনা, নৌবাহিনী এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করা। প্রাথমিক হামলায় ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও, ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা পাল্টা আঘাত হানতে প্রস্তুত।
থাড রাডার ধ্বংস করার পাশাপাশি, কাতারে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি সতর্কতামূলক রাডারও ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইরান সুপরিকল্পিতভাবে পারস্য উপসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ব্যবস্থা বা “চোখ” গুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সংঘাত এখন আর একতরফা নেই। ইরান এমন সব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে, যা কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের অস্ত্র উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি করার জন্য সমরাস্ত্র নির্মাতাদের সাথে জরুরি বৈঠক করছে, তবে এই শূন্যস্থান পূরণ করতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
ইরানের ত্রিশটি জ্বালানি স্থাপনা ধ্বংস, ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্ববাজারে আতঙ্ক
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এক অপ্রত্যাশিত নতুন মোড় নিয়েছে। পূর্বনির্ধারিত সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পরিকল্পনা বাতিল করে ইসরায়েল আচমকা ইরানের প্রায় ত্রিশটি জ্বালানি মজুতকেন্দ্রে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই আকস্মিক হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনো আগাম তথ্য ছিল না।
হামলা যখন চলমান, ঠিক তখনই ওয়াশিংটন বিষয়টি জানতে পারে। ইসরায়েলের এই পদক্ষেপে মার্কিন প্রশাসন চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এই ক্ষোভের পেছনে মূল কারণগুলো হলো:
বেসামরিক জীবনে প্রভাব: মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সরাসরি জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানা হলে তা সরাসরি ইরানের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করবে। সরকারের প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধি: যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করছে, এ ধরনের হামলা ইরান সরকারকে দুর্বল করার বদলে উল্টো সাধারণ নাগরিকদের সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলবে। বাইরের আক্রমণের মুখে সাধারণ মানুষ জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সরকারের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। ইসরায়েলের এই হামলার পরপরই বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারে চরম নার্ভাসনেস বা উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
আঞ্চলিক জ্বালানি খাতে পাল্টা আঘাতের হুমকি: ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তাদের দেশের জ্বালানি অবকাঠামোতে যদি এভাবেই আঘাত করা অব্যাহত থাকে, তবে তারা শুধু নিজেদের রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জ্বালানি অবকাঠামোতেও ব্যাপক হামলা চালাবে।
তেলের দামের সম্ভাব্য উল্লম্ফন: বাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের এই হুমকি যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে প্রতি ব্যারেল দুইশ ডলার পর্যন্ত ছুঁতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।
সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো বর্তমান সংঘাতের সময়কাল। এই তীব্র উত্তেজনার মাত্র আট দিন পার হয়েছে, আর এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত ও সিদ্ধান্তগত বড় ধরনের মতবিরোধ প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
অন্যদিকে, ইরান কোনো ধরনের আবেগপ্রবণ বা তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। তারা অত্যন্ত শান্তভাবে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, মিত্রদের মধ্যকার ফাটলগুলো হিসাব-নিকাশ করছে এবং অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য ছক কষছে।