
বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী সার্কাস ও লোকনাট্যের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ যাত্রাশিল্পকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পুনরুজ্জীবিত করার ঘোষণা দিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সুস্থ ও রুচিশীল বিনোদন নিশ্চিত করতে যাত্রা ও সার্কাসে কোনো ধরনের জীবনবিমুখ কর্মকাণ্ড, অশ্লীলতা বা নগ্ন নৃত্য সহ্য করা হবে না।
বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীর জাতীয় নাট্যশালা ভবনের সেমিনার কক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত দুই দিনব্যাপী (১৬-১৭ জুন) ‘সার্কাস ও যাত্রাপালা মানোন্নয়ন কর্মশালা’ এবং “বাংলাদেশের সার্কাস: ঐতিহ্য, শিল্পরূপ ও সংকট” শীর্ষক সেমিনারের সমাপনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এই ঘোষণা দেন।
অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী যাত্রা ও সার্কাস দলের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধে একটি বড় সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন:
এখন থেকে যাত্রাদল ও সার্কাসের প্রাথমিক অনুমতি সরাসরি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকেই প্রদান করা হবে, যাতে জেলা প্রশাসন বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো প্রকার অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানির শিকার হতে না হয়।
সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ ও শৃঙ্খলা ফেরাতে মন্ত্রণালয় থেকে খুব দ্রুত একটি যুগোপযোগী ও আধুনিক নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।
"আমাদের প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আমরা সংস্কৃতির বন্ধ্যাত্ব দূর করে মরুভূমিতে ফুল ফোটাতে চাই। তবে নতুন বাংলাদেশে সংস্কৃতির নামে কোনো অপসংস্কৃতি চলবে না।" — সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী
বক্তব্যের শুরুতে মন্ত্রী ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে বলেন, তরুণ ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে এ দেশে এক নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় রূপান্তর (ট্রান্সফরমেশন) সাধিত হয়েছে। বর্তমান সরকার সেই স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে এবং এই নতুন বাংলাদেশে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ অপরিহার্য।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি। তিনি বলেন, "মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় আমরা এক সময়কার সবচেয়ে শক্তিশালী এই সাংস্কৃতিক মাধ্যমটিকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছি। তবে যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে বাচনভঙ্গি, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, প্যান্ডেল ব্যবস্থাপনা এবং অর্কেস্ট্রায় আধুনিকতার ছোঁয়া আনতে হবে।"
অনুষ্ঠানে অন্যতম বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ড. জাহেদ উর রহমান এবং সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব জুবায়ের বাবু।
সেমিনারে ‘বাংলাদেশের সার্কাস: ঐতিহ্য, শিল্পরূপ ও সংকট’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট গবেষক ড. সাইমন জাকারিয়া। প্রবন্ধের ওপর ফলপ্রসূ আলোচনা করেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ইউসুফ হাসান অর্ক, বিশিষ্ট প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ঝুমুর আসমা জুঁই।
এছাড়া সার্কাস শিল্পের মাঠপর্যায়ের বাস্তব সংকট ও সম্ভাবনা তুলে ধরে বিশেষ আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন 'দি গ্রেট রওশন সার্কাস'-এর প্রোপাইটর শেখ আফতাব উদ্দিন এবং বাংলাদেশ সার্কাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো: শাহিন মিয়া। তারা করোনাকালীন ও পরবর্তী সময়ে এই শিল্পের আর্থিক ক্ষতি এবং তা কাটিয়ে উঠতে সরকারি প্রণোদনার দাবি জানান।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মিজ্ কানিজ মওলা-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় শতাধিক যাত্রাদল ও সার্কাস মালিক সমিতির প্রতিনিধি, প্রবীণ কলাকুশলী এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। দুই দিনব্যাপী এই কর্মশালা শেষে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে সনদপত্র বিতরণ করা হয়।