
চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় কিছুটা ইতিবাচক অগ্রগতির কথা স্বীকার করেছে ইরান। তবে তেহরান একই সঙ্গে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, আলোচনার টেবিলে বরফ গলতে শুরু করলেও এখনই চূড়ান্ত কোনো চুক্তি সই হতে যাচ্ছে—এমন ভাবার মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি।
আজ সোমবার (২৫ মে) তেহরানে আয়োজিত এক নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আলোচনার বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, "আলোচনায় বেশিরভাগ বিষয়ে আমরা একটা পর্যায়ে পৌঁছেছি। তবে এর মানে এই নয় যে এখনই চুক্তি হয়ে যাচ্ছে।"
ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যেকার এই সম্ভাব্য সমঝোতার খসড়ায় মূলত চলমান ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়সীমা আরও বাড়ানো, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের আলোচনার বিষয়গুলো এজেন্ডা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এদিকে গতকাল ভারতের নতুন দিল্লিতে অবস্থানকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানিয়েছিলেন, তিনি আশা করেছিলেন শনিবার রাতের মধ্যেই হয়তো বড় কোনো সুখবর আসবে, অথবা সোমবারের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতার ঘোষণা চলে আসতে পারে। তবে তেহরানের ধীরগতির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি সতর্ক বার্তায় বলেন, এটাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই এবং ইরানের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সাড়া পেতে কিছুটা সময় লাগছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে উভয় পক্ষই একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। তবে রোববার সুর কিছুটা বদলে তিনি বলেন:
“আলোচনা খুব সুশৃঙ্খল ও গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে। তবে আমি আমার দলকে পরিষ্কার বলে দিয়েছি— চুক্তি করার জন্য কোনো তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। সময় এখন আমাদের পক্ষে।”
আমেরিকান সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, দুই দেশের মধ্যে এখন যে আলাপ-আলোচনা চলছে তা মোটেও কোনো পূর্ণাঙ্গ বা চূড়ান্ত চুক্তি নয়। এটি মূলত একটি অন্তর্বর্তীকালীন খসড়া কাঠামো মাত্র; যেখানে তেহরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে জব্দ থাকা ইরানি অর্থ অবমুক্ত করা এবং পারমাণবিক কর্মসূচির সীমা নির্ধারণের মতো অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়গুলো পরবর্তী ধাপের আলোচনার জন্য তুলে রাখা হয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য যে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন হলো হরমুজ প্রণালি, যার ওপর দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান এই প্রণালির ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে গিয়েছিল।
তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি সমঝোতার এমন ইতিবাচক খবরের জেরে আজ সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং একই সঙ্গে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।
এদিকে ইরানের সাথে ট্রাম্পের এই আলোচনার উদ্যোগ নিয়ে খোদ তাঁর নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির অন্দরমহলেই তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দলের কট্টরপন্থী অংশের অনেকেই মনে করছেন, তেহরানের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নমনীয় আচরণ করছে।
এই বিষয়ে মার্কিন সিনেটর টেড ক্রুজ কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের প্রতি নমনীয়তা দেখালে সেটা হবে ভয়ানক ভুল। অন্যদিকে সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার মন্তব্য করেছেন, আবার ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি মানে অপারেশন এপিক ফিউরিতে অর্জিত সবকিছু নষ্ট হয়ে যাওয়া।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, "ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী করে রেখে দিলে তাহলে যুদ্ধটা শুরুই বা করলাম কেন?"