
যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও চলমান যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের ওষুধ সরবরাহব্যবস্থা বড় ধরনের চাপে পড়েছে। দেশটির বিভিন্ন ফার্মেসিতে প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ার পাশাপাশি কিছু ওষুধের দাম তিনগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় রোগী ও তাদের পরিবারকে বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সাত মাসের মাথায় ইরানের সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে। বেকারত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি চলতি সপ্তাহে দেশটির মুদ্রার মান সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। এর মধ্যে খাদ্যসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই যুদ্ধ ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়াতে তেলবাহী জাহাজে হামলার পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র গত জুন থেকে দেশটির বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে এবং একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
আমদানি-নির্ভরতার কারণে ইরানের ওষুধ শিল্পও এই পরিস্থিতিতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশটির হাসপাতালগুলোতে বড় ধরনের ওষুধ সংকটের স্পষ্ট লক্ষণ না থাকলেও সাধারণ ফার্মেসিগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
তেহরানের ওয়েল্ডার গোলামরেজা রহমানি ও তার স্ত্রী সম্প্রতি পেটের সমস্যায় ভোগা ১২ বছর বয়সী মেয়ের জন্য চার ধরনের ওষুধ কিনতে দুই দিন ধরে বিভিন্ন ফার্মেসিতে ঘুরেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ফার্মেসিতে এক বা দুটি ওষুধ পাওয়া যাচ্ছিল, সব একসঙ্গে নয়’। তিনি জানান, একটি ওষুধ তারা কোথাও খুঁজে পাননি। ওষুধের খোঁজে দুই দিন কাজে যেতে না পারায় তার মজুরিও কাটা গেছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরান তার প্রয়োজনীয় ওষুধের ৮০ শতাংশের বেশি দেশে উৎপাদন করে। তবে এসব ওষুধের বড় একটি অংশ তৈরিতে আমদানি করা কাঁচামালের ওপর নির্ভর করতে হয়। তেহরান ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য বাহমান সাবুর স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, যুদ্ধের আগে অধিকাংশ ওষুধ ও ঔষধি উপাদান সমুদ্রপথে ইরানে আনা হতো। তবে মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে ওই পথে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
এরপর মেডিকেল পণ্য আমদানিকারকেরা তুলনামূলক ব্যয়বহুল আকাশপথ ব্যবহার শুরু করেন। কিন্তু ইরানের কয়েকটি এয়ারলাইনসের ওপর নতুন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ হওয়ায় এই পথও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এর ফলে কিছু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্থগিত হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের এসেক্স ইউনিভার্সিটির স্কুল অব হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল কেয়ারের অধ্যাপক রেজা মাজেদজাদেহ বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলো সরাসরি ওষুধকে লক্ষ্য করে দেওয়া হয়নি। তবে বছরের পর বছর ধরে চলা আর্থিক নিষেধাজ্ঞাগুলো ওষুধের সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে। কারণ আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও কোম্পানিগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ার আশঙ্কায় ইরানের সঙ্গে লেনদেনে অতিরিক্ত সতর্ক থাকে।
তিনি বলেন, ইরানের কাছে ওষুধ বিক্রি করা সম্পূর্ণ বৈধ হতে পারে, কিন্তু কোনও ব্যাংক পেমেন্ট প্রসেস করতে অস্বীকার করতে পারে। একটি ফার্মাসিউটিক্যাল বা শিপিং কোম্পানি কেবল এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে ইরানের সঙ্গে লেনদেন করা ঝুঁকিপূর্ণ। লেনদেন কাগজে-কলমে বৈধ হলেও বাস্তব দুনিয়ায় তা ঘটে না।
ওষুধ উৎপাদন কতটা কমেছে, সে বিষয়ে ইরান সরকার কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমান হামলায় ৪০টির বেশি ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব কারখানার মধ্যে ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এতে ওষুধের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
অন্যদিকে নগদ অর্থের সংকটে থাকা ফার্মেসিগুলোও পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। সংসদীয় স্বাস্থ্য কমিটির সদস্য মোহাম্মদ জামালিয়াট বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতির’ কারণে বিমা কোম্পানিগুলো ফার্মেসিগুলোকে ওষুধের কভারেজ বাবদ অর্থ পরিশোধে নয় মাস পর্যন্ত পিছিয়ে পড়েছে।