
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনি জাল ও অনুসন্ধান শুরুর মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সাধারণ যাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক থাকা সব ধরনের কঠোর নিরাপত্তা তল্লাশি ও নিয়মকানুন ফাঁকি দিয়ে একদল পুলিশ সদস্যের সরাসরি প্রচ্ছন্ন সহায়তায় ২০২৪ সালের ৪ মে রাতে অত্যন্ত নির্বিঘ্নে বিদেশগামী বিমানে চড়ে বসেন তিনি। দীর্ঘ দুই বছর পর সুদূর দুবাইয়ের মাটিতে তাঁর নাটকীয় গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ্যে আসার পর, সাবেক এই প্রভাবশালী কর্মকর্তার সেই বহুল আলোচিত দেশত্যাগের চাঞ্চল্যকর অধ্যায়টি নতুন করে টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে।
গত শুক্রবার (১২ জুন) বাংলাদেশ পুলিশ দুবাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে একটি জরুরি বার্তা পায়। চাঞ্চল্যকর এই তথ্যটি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম। একই সাথে জাতীয় সংসদকে এই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন যে, প্রয়োজনীয় সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে খুব দ্রুতই বেনজীর আহমেদকে দেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনা হবে।
আইনি নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল বেনজীর আহমেদের আকাশচুম্বী অবৈধ সম্পদের খোঁজে একটি বিশেষ অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছিল দুদক। তবে তদন্ত শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানেই তিনি গোপনে দেশত্যাগের চতুর পরিকল্পনা করেন। পরবর্তীতে গভীর তদন্তে বেরিয়ে আসে, ২০২৪ সালের ৪ মে রাতেই ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে তিনি সরাসরি দুবাইয়ের উদ্দেশে উড়াল দিয়েছিলেন।
উক্ত রাতের বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিমানবন্দরে দায়িত্বরত বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিশেষ প্রটোকল ও প্রচ্ছন্ন সহায়তায় কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই তিনি অভিবাসন ও নিরাপত্তার সব আনুষ্ঠানিকতা দ্রুত সম্পন্ন করেন। এরপর ঠিক রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি শিডিউল ফ্লাইটে চেপে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন।
ভিডিও ফুটেজের দৃশ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত নিরাপত্তা তল্লাশির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় বেনজীর আহমেদের ঠিক সামনে পথপ্রদর্শক হিসেবে হাঁটছিলেন ইউনিফর্ম পরিহিত একজন পুলিশ সদস্য এবং সাদা পোশাকের একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা। একই সময়ে তাঁর ঠিক পেছনেও আরেকজন ইউনিফর্মধারী পুলিশ সদস্যকে নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। তবে দেশ ছাড়ার সেই মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে পরিবারের কোনো সদস্য ছিলেন না। সিসিটিভিতে একা থাকা বেনজীর আহমেদের পরনে ছিল একটি সোনালি রঙের হাফ শার্ট, গাঢ় রঙের প্যান্ট ও পায়ে কালো জুতা।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য মিলেছে সবশেষ নিরাপত্তা তল্লাশি চৌকির ফুটেজে। সেখানে দেখা যায়, কাউন্টারে দায়িত্বরত আনসার সদস্যের নিয়মমাফিক শারীরিক তল্লাশি (বডি স্ক্যানিং) ছাড়াই তিনি অত্যন্ত আয়েশি ভঙ্গিতে চেকপয়েন্ট পার হয়ে যান। সাধারণ ও সাধারণ আমজনতার জন্য যেখানে প্রতিটি ধাপে বাধ্যতামূলক মেটাল ডিটেক্টর ও শারীরিক তল্লাশির কঠোর বিধান রয়েছে, সেখানে সাবেক এই আইজিপির বেলায় তার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করা হয়নি।
এর বাইরে, বিমানবন্দরে কর্তব্যরত ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাঁর পাসপোর্টে প্রয়োজনীয় সিল ও যাবতীয় বহির্গমন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে তাঁর লাগেজ ও পাসপোর্ট নিজের হাতে বুঝিয়ে দেন। ফ্লাইটে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে বিদায় জানাতেও দেখা যায় এই পলাতক আসামিকে।
এক সময়ের মাঠ কাঁপানো ও পুলিশ বাহিনীর অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের আইজিপির সর্বোচ্চ পদ সামলেছেন। এর আগে, তিনি ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) শীর্ষ কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালনের রেকর্ড রয়েছে তাঁর। আলোচিত এই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার পৈতৃক বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়।
সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত বেনজীর আহমেদ সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পরও বিপুল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও রাজকীয় নিরাপত্তা ভোগ করে আসছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, অবসরের পরও সরকারি গাড়িসহ মোট ছয় সদস্যের একটি সাদা পোশাকের পুলিশ দল সার্বক্ষণিক তাঁর প্রটোকল ও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। এর পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত সুরক্ষায় দুজন সশস্ত্র দেহরক্ষী (বডিগার্ড) এবং তাঁর বিলাসবহুল বাসভবনের পাহারায় তিনজন বিশেষ নিরাপত্তাকর্মী সার্বক্ষণিক নিয়োজিত ছিলেন।