
গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, এই নির্যাতনকেন্দ্র আজও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার নৃশংসতার জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করছে। তাঁর ভাষায়, এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়; বরং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুম, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বাস্তব চিত্র।
শনিবার (১ আগস্ট) র্যাব-১ সদর দপ্তরে অবস্থিত টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল, যা ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত, পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মো. আমিনুল ইসলাম জানান, আয়নাঘরের ভেতরের দৃশ্য অত্যন্ত ভয়াবহ। সেখানে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২৯টি কক্ষ বা সেল পাওয়া গেছে। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ভিন্নমতের মানুষকে অপহরণ করে এসব কক্ষে বছরের পর বছর আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন চালানো হতো। পরে কাউকে দীর্ঘদিন পর মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে থানায় পাঠানো হতো, আবার অনেককে হত্যা করে তাদের মরদেহ গুম করে ফেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর উদ্ধার হওয়া কয়েকজন ভুক্তভোগী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাদের মধ্যে ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান অন্যতম। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে টিএফআই সেলে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার বিচার কার্যক্রম চলছে। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত গুম ও হত্যার শিকার প্রায় ২৫০ জনের বেশি মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের তালিকায় ইলিয়াস আলী ও সুমনও রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকেও একসময় এই টিএফআই সেলের একটি কক্ষে আটক রাখা হয়েছিল। পরে তাঁকে ভারতে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। সাক্ষ্যপ্রমাণ ও তদন্তে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
দায়ীদের বিচারের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মাঠপর্যায়ে নির্যাতনে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি যারা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন বা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। এ উদ্দেশ্যে প্রসিকিউশন টিম ও তদন্ত সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম পরিচালনার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ন্যায়বিচারের স্বার্থে শনিবার বেলা ১১টার দিকে আয়নাঘর পরিদর্শন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এ সময় চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম ছাড়াও প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, শাইখ মাহদী, সহিদুল ইসলাম সরদার, তাসমিরুল ইসলাম, মঈনুল করিমসহ প্রসিকিউশন টিমের সদস্য এবং আসামিপক্ষের কয়েকজন আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।