
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১০ মাসে ৪২টি কর্মসূচি বাস্তবায়নে তহবিল থেকে ১ কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা বরাদ্দ নিয়েছে। তবে এর মধ্যে ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকার বিল-ভাউচার এখনো জমা পড়েনি। রাকসুর কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের নথি বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
নথিতে দেখা যায়, রাকসুর বিভিন্ন পদধারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ পেয়েছেন সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার। সাত ধাপে তার নামে মোট ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিন ধাপে উত্তোলন করা ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার ব্যয়ের কোনো ভাউচার জমা হয়নি।
এই অর্থের মধ্যে রয়েছে ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় বুথ স্থাপনের জন্য নেওয়া ৩ লাখ ২ হাজার টাকা, ২৭ জানুয়ারি রাকসু সংসদ সদস্যদের জানুয়ারি মাসের বাজেট হিসেবে নেওয়া ১৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা এবং ১৩ এপ্রিল সদস্যদের দাপ্তরিক ব্যয়ের জন্য নেওয়া ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
বিষয়টি নিয়ে জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষার বুথ বসানোর সময় এটি আমাদের প্রথম দিকের বাজেট ছিল। তখন ব্যয়ের ওপর ভ্যাট যোগ করা হবে, এটা জানা ছিল না। ফলে এই ৩ লাখ টাকার হিসাব সমন্বয় করে বিল করা কিছুটা সমস্যার হয়েছে। সাংসদদের জন্য নেওয়া ওই টাকার মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদকের হিসাব না আসায় সেটি জমা দেওয়া হয়নি। বাকি আরেকটি জমা দেওয়া হয়েছে।’
নথি অনুযায়ী, ভাউচার জমা না দেওয়া ওই তিন কর্মসূচির কার্যক্রম এখনো চলমান। তবে কয়েকটি অন্য কর্মসূচি এক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস আগেই শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে রাকসুর সহ-সভাপতির (ভিপি) দাপ্তরিক খরচের জন্যও সাড়ে ৩ লাখ টাকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
১৩ লাখ টাকা নিয়ে হিসাব দিয়েছেন মাত্র ৯৯ হাজারের
রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের নামে ছয় ধাপে মোট ১৩ লাখ ৪০ হাজার ৩২৪ টাকা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঈদুল আজহার একটি কর্মসূচির ৯৯ হাজার ৯২৪ টাকার ভাউচার জমা পড়েছে। বাকি ১২ লাখ ৪০ হাজার ৪০০ টাকার কোনো ভাউচার নেই।
নথি বলছে, ১৩ এপ্রিল দাপ্তরিক ব্যয়ের জন্য ভিপি দেড় লাখ টাকা নেন। ওই অর্থের হিসাব জমা দেওয়ার আগেই ১৯ জুলাই একই খাতে আরও ২ লাখ টাকা উত্তোলন করেন। এছাড়া ৩ আগস্ট ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা প্রদর্শনের জন্য ৩ লাখ ৮২ হাজার ৪০০ টাকা, একই দিনে ‘ভিক্টরি রান উইথ রাকসু’ কর্মসূচির জন্য ৩ লাখ টাকা এবং ৬ আগস্ট ‘জুলাই জাদুঘর’ স্থাপনে ২ লাখ ৮ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এসব অর্থের কোনো ভাউচার জমা পড়েনি।
ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘একেবারে কোনো বিল জমা দেওয়া হয়নি, বিষয়টি এমন নয়। বিল-ভাউচার দ্রুত দেওয়া ভালো। তবে মেয়াদের মধ্যে জমা দিলেও হবে। আমাদের মেয়াদের এখনো ৬০ দিন বাকি রয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অডিট হবে, এর আগেই আমরা বিল-ভাউচার জমা দেব। কারও বিল-ভাউচারে গরমিল থাকলে প্রয়োজনে পকেটের টাকা দিয়ে সেটি পূরণ করা হবে।’
জিএসের পর বেশি বরাদ্দ ক্রীড়া সম্পাদকের
জিএসের পর সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছেন ছাত্রদল মনোনীত প্যানেল থেকে নির্বাচিত রাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক মোছা. নার্গিস খাতুন। সাত ধাপে তার নামে মোট ১৫ লাখ ৭১ হাজার ৬২৬ টাকা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চার ধাপে উত্তোলন করা ১৩ লাখ ৯৭ হাজার ১২৬ টাকার ভাউচার জমা হয়নি।
রাকসু গেমসের জন্য দুই ধাপে ১২ লাখ ৭২ হাজার ৩৪০ টাকা নেওয়া হয়েছে। গত মাসে শুরু হওয়া ছয়টি ইভেন্ট এখনো চলমান থাকায় এসব অর্থের বিল জমা দেওয়া হয়নি বলে জানান নার্গিস খাতুন।
গত মে মাসে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জন্য দুই ধাপে নেওয়া ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৮৬ টাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিলটি রেডি করা আছে। ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলমান থাকায় জমা দিতে পারিনি। যেকোনো সময় এটি জমা দিয়ে দেব।’
রাকসুর বিতর্ক ও সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদক ইমরান লস্কর ছয় ধাপে ৮ লাখ ৪২ হাজার ৭৬৫ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে দুটি লেনদেনের ভাউচার জমা পড়েছে, তবে একটিতে বাজেট ঘাটতি রয়েছে। বাকি ৬ লাখ ৯২ হাজার টাকার ভাউচার জমা হয়নি।
ইমরান লস্কর বলেন, ‘আমার বাজেট অনেকগুলো ক্লাব ও সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হয়। ফলে দুটি কর্মসূচির বিল জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। আমি আজকে বা কালকে বিলগুলো জমা দেব। ঘাটতি বাজেটের বিষয়টি হলো, ওই কর্মসূচিতে খরচ বেশি হয়েছিল। সেটি আমার ল্যাপটপে সংরক্ষিত আছে।’
রাকসুর সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক জাহিদ হোসেন জোহা তিন ধাপে ৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান উদযাপনের জন্য নেওয়া ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকার ভাউচার জমা হয়নি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে জাহিদ হোসেন জোহা দাবি করেন, তার কর্মসূচির সব বিল-ভাউচার জমা হয়েছে। একটি কর্মসূচির জন্য আরও অর্থ উত্তোলন করা বাকি থাকায় সেটি অন্য কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করা হবে বলে জানান তিনি।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি.এম. নাজমুল সাকিব তিন ধাপে ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৬ আগস্ট ‘সংশ্লিষ্ট পদ বিষয়ক কর্মশালা’ আয়োজনের জন্য নেওয়া ৩ লাখ ১০ হাজার টাকার ভাউচার জমা হয়নি।
নাজমুল সাকিব বলেন, ‘আমার সবশেষ বাজেটের হিসাব দেওয়া হয়নি। গত সপ্তাহে এই টাকা দিয়ে একটি শিক্ষা সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। সেমিনারে সব হিসাব বুঝে নিয়ে আগামীকাল বা পরশু আমরা বিল জমা দিয়ে দেব।’
মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. মুজাহিদ ইসলাম তিন ধাপে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪৪৮ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৬ আগস্ট প্রকাশনার জন্য নেওয়া ১ লাখ টাকার ভাউচার জমা হয়নি। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল ধরেননি।
মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সায়িদা হাফসা দুই ধাপে ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৭৬ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে মে মাসে আয়োজিত নারী উদ্যোক্তা মেলার জন্য নেওয়া ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ টাকার হিসাব জমা হয়নি।
সায়িদা হাফসা বলেন, ‘আমাদের এই মেলার সঙ্গে ফটো কনটেস্ট আয়োজনের কথা ছিল। তবে সেটি না হওয়ায় বিলটি জমা দেওয়া হয়নি। আমি রাকসু কার্যালয়ে এসেছি এটি নিয়েই কাজ করতে। আগামীকালের মধ্যে জমা দিয়ে দেব।’
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ তোফা দুই ধাপে ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১ জুলাই নেপালে শিক্ষা বিষয়ক একটি সেমিনারে অংশগ্রহণের জন্য নেওয়া ৩৭ হাজার ৫০০ টাকার হিসাব জমা হয়নি।
তোফায়েল আহমেদ তোফা বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে উপাচার্যের কাছে সেমিনারে যোগ দিতে আর্থিক সহায়তা চেয়েছিলাম। তবে এটা রাকসুর তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছে, তা আমার জানা ছিল না। তবে আমার প্রয়োজনীয় কাগজ আবেদনপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করেছি।’
পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ ২৬ জুলাই কোনো খাত উল্লেখ না করে ৮২ হাজার টাকা নিয়েছেন। এরও কোনো ভাউচার জমা হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমার কর্মসূচির অনেক টাকা বেঁচে গেছে। অতিরিক্ত ওই টাকা ফেরতসহ দুই-এক দিনের মধ্যেই ভাউচার জমা দেব।’
এজিএস এস এম সালমান সাব্বির ৫ মার্চ দাপ্তরিক ব্যয়ের জন্য ৬০ হাজার টাকা নিলেও এর কোনো হিসাব জমা দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া কম্পিউটার সেট ও প্রিন্টার কেনার জন্য ১ লাখ ২৩ হাজার ৭৫০ টাকা নেওয়ার তথ্যও নথিতে রয়েছে। তবে অর্থটি কে নিয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ অর্থেরও কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি।
সাবেক নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য
রাকসুর সাবেক নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, সরকারি কোনো ব্যয় মেটাতে অগ্রিম অর্থ নিলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার হিসাব সমন্বয় করার নিয়ম রয়েছে। একটি বিল সমন্বয় না করে পরবর্তী ধাপে অর্থ নেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, কোনো সম্পাদক আগের বিলের হিসাব সমন্বয় না করেই নতুন বিলের অর্থ নিলে সেটিকে আর্থিক অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তার ভাষ্য, প্রতিটি সম্পাদকীয় পদের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকে। ভিপি বা জিএস অন্য কোনো পদের বরাদ্দের অর্থ নিতে পারেন না। তবে নিজস্ব বরাদ্দের বাইরে স্পন্সরশিপ সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও সেই অর্থও ইচ্ছামতো ব্যয় করা যায় না। আর্থিক বিধি অনুযায়ী সব ব্যয়ের হিসাব রাকসুর সভায় উপস্থাপন করতে হবে। ওই সভায় সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষের উপস্থিতি থাকতে হবে। অনিয়ম দেখা দিলে কোষাধ্যক্ষের ফাইল আটকে দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে।
কোষাধ্যক্ষ যা বলছেন
রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান নথিটির সত্যতা সম্পর্কে বলেন, তালিকায় নতুন কিছু তথ্য হালনাগাদ করা হয়েছে। তবে নথিটি কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের বলে নিশ্চিত করে তিনি অনেক বিল-ভাউচার এখনো জমা না পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, ‘যেকোনো কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাউচার জমা দেওয়া উচিত। রাকসুর কিছু বিল-ভাউচার এখনো জমা হয়নি। আমরা তাদের সঠিক নিয়মে জমা দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছি।’
রাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘যেকোনো কর্মসূচি আয়োজন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিল-ভাউচারসহ আর্থিক হিসাব জমা দেওয়া উচিত। প্রতিটি সভায় হিসাবের বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে মনে করিয়ে দিয়েছি। রাকসুর প্রতিনিধিরা একটু সময় চেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো টাকা ব্যয় করলে অবশ্যই বিল-ভাউচার জমা করতে হবে। রাকসুকেও এই প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে।’