
সিরিয়ায় রাশিয়ার দুটি সামরিক ঘাঁটির ভবিষ্যৎ নিয়ে মস্কোর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে দেশটির নতুন সরকার। ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে সামরিক সহায়তা দিতে এতদিন এসব ঘাঁটি ব্যবহার করত রাশিয়া।
রোববার সিরিয়ার সরকারি সংবাদ সংস্থা সানার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা।
নতুন সমঝোতা অনুযায়ী, সিরিয়ার হেমেইমিম বিমানঘাঁটি ও তারতুস নৌঘাঁটি এখন থেকে ‘যৌথ প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বাড়ানোর কেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রায় ১৮ মাস ধরে আলোচনার পর দুই পক্ষ সমঝোতা স্মারকটি চূড়ান্ত করেছে।
তিন মাসের মধ্যে কার্যকর নতুন ব্যবস্থা
নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য সর্বোচ্চ তিন মাসের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সমঝোতা কার্যকর হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে দুই ঘাঁটিতে থাকা বেসামরিক স্থাপনাগুলো সিরিয়া সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
তবে নতুন ব্যবস্থার আওতায় রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতির ধরন কী হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এই সমঝোতা নিয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আলোচনার পুরো সময়ই হেমেইমিম বিমানঘাঁটি ও তারতুস নৌঘাঁটি সচল ছিল।
ঘাঁটি পরিদর্শনে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী
রোববার সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি হেমেইমিম ও তারতুসের স্থাপনাগুলো পরিদর্শন করেন। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে অন্তর্ভুক্ত স্থাপনা ও অবকাঠামো দেখতেই তিনি সেখানে যান। এই পরিদর্শনকে দুই দেশের নতুন সম্পর্কের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিরিয়ার ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধের সময় বাশার আল-আসাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ছিল রাশিয়া।
আসাদকে ক্ষমতায় রাখতে সামরিক সহায়তা
আসাদ সরকারের ক্ষমতা ধরে রাখতে রাশিয়া সামরিক সহায়তা দিয়েছিল। বিশেষ করে হেমেইমিম বিমানঘাঁটি ও তারতুস নৌঘাঁটি থেকে সিরিয়ায় নিজেদের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করত রাশিয়া।
তবে ২০২৪ সালে আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সিরিয়ার পরিস্থিতি বদলে যায়। তার পতন মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবস্থানের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হয়। আসাদ ক্ষমতা হারানোর পর সিরিয়ায় রাশিয়া নিজেদের সামরিক উপস্থিতি পুরোপুরি ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে শারার আগ্রহ
আসাদের পতনের পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সিরিয়ার নতুন নেতা আহমেদ আল-শারার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। এর অন্যতম লক্ষ্য হলো সিরিয়ায় রাশিয়ার দুটি সামরিক ঘাঁটির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে এই দুটি ঘাঁটি রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সামরিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে পড়ে। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর পুতিন মস্কোতে আহমেদ আল-শারাকে দুইবার গ্রহণ করেছেন বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
জানুয়ারিতে শারার আগের মস্কো সফরের সময় পুতিন বলেছিলেন, রাশিয়া ও সিরিয়ার সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে অনেক কাজ হয়েছে। সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা পুনরুদ্ধারে শারার উদ্যোগেরও প্রশংসা করেন তিনি।
আহমেদ আল-শারাও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার আগ্রহ দেখিয়েছেন। তিনি সিরিয়া ও বৃহত্তর অঞ্চলে রাশিয়ার ‘ঐতিহাসিক ভূমিকার’ প্রশংসা করেছেন।
আসাদকে ফেরত চায় দামেস্ক
তবে একই সময়ে দামেস্ক দীর্ঘদিন ধরে মস্কোর কাছে বাশার আল-আসাদকে সিরিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতেই অবস্থান করছেন। তিনি স্ত্রীকে নিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন।
ফলে একদিকে আসাদকে নিয়ে সিরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে, অন্যদিকে সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে দুই দেশ সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
হেমেইমিম বিমানঘাঁটি ও তারতুস নৌঘাঁটি সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আসাদ সরকারের সময় এসব ঘাঁটি রাশিয়ার জন্য বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছিল।
নতুন পর্যায়ে সিরিয়া-রাশিয়া সম্পর্ক
নতুন সমঝোতায় ঘাঁটি দুটিকে যৌথ প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বাড়ানোর কেন্দ্রে পরিণত করার সিদ্ধান্ত সিরিয়া-রাশিয়া সম্পর্কের নতুন পর্যায়কে সামনে এনেছে।
তবে এই ব্যবস্থায় রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি ঠিক কতটা থাকবে এবং ঘাঁটি দুটির নিয়ন্ত্রণ কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
তিন মাসের মধ্যে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করার কথা রয়েছে। এর আগে দুই ঘাঁটিতে থাকা বেসামরিক স্থাপনাগুলো সিরিয়া সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।