
পারিবারিক বিরোধের জেরে স্বামীকে খুন করার পর নৃশংসতার সব সীমা ছাড়িয়ে গেলেন এক নারী। শুধু হত্যা করাই নয়, ধারালো ছুরি দিয়ে স্বামীর মৃতদেহ কেটে ছয়টি খণ্ড করেন তিনি। এরপর বীভৎসভাবে লাশের হাড় ও মাংস আলাদা করে টানা তিন দিন ড্রামে লুকিয়ে রাখেন। শেষ রক্ষা হয়নি তখন, যখন সেই খণ্ডিত মাংসের টুকরোগুলো অন্য একটি বাসার ফ্রিজে লুকিয়ে রাখতে যান তিনি। সেখান থেকে ছড়ানো তীব্র দুর্গন্ধে বেরিয়ে আসে এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য।
ভয়াবহ ও চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে শরীয়তপুর সদর উপজেলায়। শুক্রবার (১৫ মে) রাতে এই নৃশংস কর্মকাণ্ডের হোতা আসমা আক্তারকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নিজের অপরাধ স্বীকার করে আসমা আক্তার বলেন, ‘চাকু দিয়ে লাশ টুকরো টুকরো করে কয়েক জায়গায় ফেলে দেই। আমি জীবনে একটা পিঁপড়াও মারিনি। কিন্তু এ ঘটনা কিভাবে ঘটে গেল, বুঝতে পারিনি।’
নিহত ব্যক্তির নাম জিয়া সরদার। তিনি শরীয়তপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ মাহমুদপুর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং একজন মালয়েশিয়া প্রবাসী ছিলেন।
পরকীয়া থেকে প্রেম, অতঃপর রক্তক্ষয়ী পরিণতি
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জিয়া সরদার যখন মালয়েশিয়ায় কর্মরত ছিলেন, তখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পিরোজপুর জেলার মেয়ে আসমা আক্তারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আট বছর আগে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এটি ছিল জিয়া ও আসমা উভয়েরই দ্বিতীয় বিয়ে। বিয়ের পর জিয়া তাঁর স্ত্রীকে শরীয়তপুর শহরের উত্তর পালং সাবনুর মার্কেট এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় রাখেন। গত বছর জিয়া স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসার পর তাঁরা চন্দ্রপুর বাজারের গ্রামীণ ব্যাংকের পেছনের এলাকায় আরেকটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন।
সম্প্রতি এই দম্পতির মধ্যে তীব্র পারিবারিক কলহ শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১২ মে রাতে দুজনের মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া ও কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে আসমা একটি লোহার রড দিয়ে জিয়ার মাথায় সজোরে আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই জিয়ার মৃত্যু হয়। এরপর হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ লোপাট করতে আসমা একটি ধারালো ছুরি দিয়ে জিয়ার দেহ ছয়টি টুকরো করেন এবং হাড় থেকে মাংস আলাদা করে তিন দিন ধরে ড্রাম ও ফ্রিজে রেখে দেন।
লাশ গুমের চেষ্টা ও ফ্রিজে রাখতে গিয়ে ধরা
টানা তিন দিন লাশ ঘরে রাখার পর, গত শুক্রবার রাতে আসমা একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন। এরপর ড্রাম থেকে লাশের একাংশ বের করে সাদা প্লাস্টিকে মুড়িয়ে নড়িয়ার মুলফৎগঞ্জ এলাকায় ছদ্মনামে পদ্মা নদীর তীরে ফেলে আসেন। দেহের আরেকটি অংশ বস্তায় ভরে শরীয়তপুর পৌরসভার আটং এলাকার বৃক্ষতলা নামক স্থানে ফেলে দেন।
সবশেষে, বিভীষিকাময় উপায়ে আলাদা করা স্বামীর মাংসের টুকরোগুলো নিয়ে আসমা উত্তর পালং সাবনুর মার্কেট এলাকার তাঁর আগের ভাড়া বাসায় যান এবং সেখানকার এক ভাড়াটিয়ার ফ্রিজে তা রাখার চেষ্টা করেন। এ সময় পচা মাংসের তীব্র গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। তারা তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করেন।
জবানবন্দি ও খণ্ডিত অংশ উদ্ধার
খবর পেয়ে পালং মডেল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আসমাকে আটক করে এবং নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে তিনি অকপটে স্বামীকে খুনের কথা স্বীকার করেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে জিয়ার খণ্ডিত দেহাংশ উদ্ধার করা হয়। একই রাতে নড়িয়ার পদ্মা নদীর তীর থেকে নিহতের বিচ্ছিন্ন চার হাত-পা উদ্ধার করে নড়িয়া থানা পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের শিকার জিয়ার আত্মীয় শাহাদাত হোসেন শাহেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ভাই প্রবাসে থাকাকালীন ওই নারীকে বিয়ে করেন। ভাই দেশে আসার পর আলাদা একটি জায়গায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। আমার ভাইকে হত্যা করে ড্রামে ভরে লাশ ফেলে রেখেছেন ওই নারী। পুলিশ ওই নারীকে আটক করেছে।’
অন্যদিকে, সাবনুর মার্কেট এলাকার প্রত্যক্ষদর্শী রানু বেগম বলেন, ‘আসমা পচা মাংস ফ্রিজে রাখতে এলে গন্ধ ছড়ায়। এতে আমাদের সন্দেহ হয়। তখন আমরা পুলিশকে জানাই। পরে পুলিশ এসে তার স্বামীর মাংসসহ আসমাকে আটক করে।’
গ্রেপ্তারকৃত আসমা আক্তার নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে দাবি করেন, ‘আমার স্বামী প্রায়ই আমাকে মারধর করতেন। ১২ মে রাতে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে তাকে মাথায় রড দিয়ে আঘাত করলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। আমি বুঝতে পারিনি এতো জোরে আঘাত লাগবে। পরে চাকু দিয়ে লাশ টুকরো টুকরো করে কয়েক জায়গায় ফেলে দেই। আমি জীবনে একটা পিঁপড়াও মারিনি। কিন্তু এ ঘটনা কিভাবে ঘটে গেল, বুঝতে পারিনি।’
পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ‘আসমা তার স্বামী জিয়া সরদারকে হত্যার পর হাত-পা টুকরো টুকরো করে মাংস আলাদা করে ফেলেন। পরে শুক্রবার সন্ধ্যায় ড্রামে ভরে অটোরিকশা করে লাশের বিভিন্ন অংশ কয়েকটি জায়গায় ফেলে রাখেন। পরে মাংসগুলো তার আগের ভাড়া বাসায় ফ্রিজে রাখতে গেলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল দেন। আমরা ড্রাম খুলে বিষয়টি নিশ্চিত হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তিনি সব কথা স্বীকার করেন।’
ওসি আরও যোগ করেন, ‘পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃক্ষতলা এলাকার একটি পুকুর থেকে মাথাসহ হাড় উদ্ধার করি। এ ঘটনায় তদন্ত চলছে।’