
বক্তব্যের শেষে মুখ ফসকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়ার অপরাধে এক প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্য সভায় হেনস্তা ও জোরপূর্বক ক্ষমা চাইতে বাধ্য করার এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার হাজিনগর ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) একটি উন্মুক্ত বাজেট সভা চলাকালীন এই ঘটনা ঘটে। এই লাঞ্ছনার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
ভুক্তভোগী ওই বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম মিজানুর রহমান। অভিযোগের তির আলাউদ্দিন নামে এক যুবকের দিকে, যিনি নিজেকে স্থানীয় যুবদল কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। আলাউদ্দিন হাজীনগর ইউনিয়নের মাকলাহাট গ্রামের বাসিন্দা। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর সচেতন মহল ও স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুরে হাজীনগর ইউপির উন্মুক্ত বাজেট সভার সূচনালগ্নে স্বাগত বক্তব্য রাখছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান। বক্তব্যের একেবারে শেষ পর্যায়ে তিনি ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে বসেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তাৎক্ষণিকভাবেই তিনি বুঝতে পেরে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং জানান যে এটি ভুলবশত হয়েছে। কিন্তু সভাস্থলে উপস্থিত আলাউদ্দিন নিজেকে যুবদলের কর্মী দাবি করে সেখানে হট্টগোল ও উত্তেজনা সৃষ্টি করেন। একপর্যায়ে আলাউদ্দিন ও তাঁর সহযোগীরা ওই প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধার সাথে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং সভাস্থলের মাইক কেড়ে নিয়ে সবার সামনে তাঁকে পুনরায় করজোড়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন।
চরম ক্ষোভ ও মানসিক আঘাত নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করেছি। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এখন এই স্লোগান দেওয়া যে কারও জন্য বিপজ্জনক। গতকাল সভায় মুখ ফসকে জয় বাংলা বলার পর আমি সঙ্গে সঙ্গে ভুল স্বীকার করি। এরপরও সবার সামনে আমাকে লাঞ্ছিত করা হয় এবং মাইকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়।’
এদিকে অভিযুক্ত আলাউদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে যুবদলের কর্মী হিসেবে দাবি করলেও সংগঠনের কোনো আনুষ্ঠানিক পদে থাকার প্রমাণ দিতে পারেননি। নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি বলেন, ‘মিজানুর রহমান বক্তব্যের একপর্যায়ে “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান দেন। সঙ্গে সঙ্গে আমিসহ কয়েকজন প্রতিবাদ করি। সবাই যখন উত্তেজিত হয়ে যায়, তখন বিষয়টি অন্যভাবে চলে যায়। পরে মিজানুর রহমান মাইকে সবার কাছে ক্ষমা চান। এখানে আমাকে একাই দায়ী করা হচ্ছে।’
এই রাজনৈতিক পরিচয় প্রসঙ্গে হাজীনগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ফিরোজ মাহমুদ স্পষ্ট করে জানান, আলাউদ্দিন নিজেকে বিএনপি বা যুবদলের নেতা দাবি করলেও বাস্তবে দলটির কোনো স্তরেই তাঁর কোনো সাংগঠনিক পদ নেই। তিনি কেবল রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেই বিএনপির নাম ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। এমনকি অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের হয়ে কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার নজির রয়েছে বলেও জানান এই বিএনপি নেতা।
প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাকে অপমানের এই ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নওগাঁ জেলা ইউনিটের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে “জয় বাংলা” স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে হেনস্তা করা দুঃখজনক। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরাও “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান দিয়েছি। যদিও পরবর্তী সময়ে এই স্লোগানের অপব্যবহার করে বিতর্কিত করে ফেলা হয়েছে।’