
ঈদের আনন্দ ম্লান করে মাত্র আট ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের তিন জেলায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন ১৯ জন। শনিবার (২১ মার্চ) গভীর রাত থেকে রোববার (২২ মার্চ) সকাল ১১টা পর্যন্ত কুমিল্লা, ফেনী ও হবিগঞ্জে এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো ঘটে।
সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটে কুমিল্লায়, যেখানে বাস ও ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হন। হবিগঞ্জে একটি পিকআপ ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গিয়ে চারজনের মৃত্যু হয়। আর ফেনীতে বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে প্রাণ যায় তিনজনের।
কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে শনিবার দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে ভয়াবহ বাস-ট্রেন সংঘর্ষ ঘটে। এতে নিহতদের মধ্যে সাতজন পুরুষ, দুইজন নারী এবং তিনজন শিশু রয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী ওয়ান আপ ট্রেনটি পদুয়ার বাজার রেল ক্রসিংয়ে পৌঁছালে রেললাইনের ওপর থাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর ট্রেনটি বাসটিকে প্রায় এক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।
খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। ট্রেনের যাত্রী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, রেল গেইটের সিগন্যালম্যানের অবহেলার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। দুর্ঘটনার পর ট্রিপল নাইনে একাধিকবার ফোন করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
এই ঘটনায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। একই সঙ্গে হেলাল ও মেহেদী হাসান নামে দুই গেটম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. অজয় ভৌমিক বলেন, "আমরা এ পর্যন্ত হাসপাতালে ১২ জনের মরদেহ পেয়েছি। ইতোমধ্যে দুইজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে বাকি ১০ জনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি।"
কুমিল্লার ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে আরেকটি দুর্ঘটনায় চারজন নিহত হন। রোববার ভোরে একটি পিকআপ ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের খালে পড়ে গেলে এই প্রাণহানি ঘটে। নিহতদের মধ্যে এক নারী ও এক কিশোরও রয়েছে।
পুলিশ জানায়, সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি পিকআপকে খালে উল্টে থাকতে দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, গভীর রাত বা ভোরের কোনো এক সময় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। পরে রেকার দিয়ে উদ্ধারকালে গাড়ির ভেতর থেকে এক নারী, ১২ বছর বয়সী এক কিশোরসহ মোট চারজনের মরদেহ পাওয়া যায়।
মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহেল রানা জানান, মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে এবং নিহতদের পরিচয় শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ। তিনি আরও বলেন, "এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।"
অন্যদিকে ফেনীর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী-রামপুর এলাকায় রোববার ভোরে বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন এবং আরও পাঁচজন আহত হন।
মহিপাল হাইওয়ে থানার ইনচার্জ আসাদুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রামমুখী একটি লেনে কাজ চলায় একটি অ্যাম্বুলেন্স ধীরগতিতে চলছিল। এ সময় শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস পেছন থেকে অ্যাম্বুলেন্সটিকে ধাক্কা দেয়। এরপর দুই চালকের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হলে পেছনে যানজট তৈরি হয়। কিছুক্ষণ পর দোয়েল পরিবহনের একটি দ্রুতগতির বাস এসে সেই জটলার মধ্যে সজোরে ধাক্কা দিলে ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে।
এই দুর্ঘটনায় এক মোটরসাইকেল আরোহী, বাসের সুপারভাইজার এবং এক যাত্রী নিহত হন। নিহত ও আহতদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে।
ফেনী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. শাহাদাৎ হোসেন জানান, ঘটনাস্থল থেকে দুর্ঘটনাকবলিত যান সরিয়ে আহতদের উদ্ধার করে ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।