
লোহিত সাগরের পর এবার কি হরমুজ প্রণালী? মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ যত বাড়ছে, বিশ্বজুড়ে ডেটা বা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা ততটাই ঘনীভূত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালী’র তলদেশে থাকা আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্কের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে ইরান। তেহরানের এই তৎপরতা বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এক নজিরবিহীন ও চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।
সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রচ্ছন্ন হুমকি
গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে সিএনএন জানাচ্ছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালীর গভীর সমুদ্রের তলদেশে থাকা ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবলগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও মানচিত্র পর্যবেক্ষণ করছে। পশ্চিমের সাথে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ডিজিটাল যোগাযোগের মূল ধমনী বলা চলে এই রুটটিকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো কারণে যদি এই ক্যাবলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত বা বিচ্ছিন্ন করা হয়, তবে বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেন, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং কোটি কোটি মানুষের ইন্টারনেট সংযোগ মুহূর্তের মধ্যে স্থবির হয়ে পড়বে।
লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের দ্বারা সাবমেরিন ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনার পর থেকেই এই সমুদ্রগর্ভের ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছিল। এখন হরমুজ প্রণালীতে ইরানের এই সরাসরি তৎপরতা সেই উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কেন হরমুজ প্রণালী এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বের মোট খনিজ তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে। তবে তেলের পাশাপাশি এটি যে বৈশ্বিক ডেটা স্থানান্তরেরও অন্যতম প্রধান মহাসড়ক, তা প্রায়শই আড়ালে থেকে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর পাশাপাশি ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যকার সিংহভাগ ডিজিটাল ট্রাফিক বা ডেটা এই প্রণালীর তলদেশের ফাইবার অপটিক ক্যাবল দিয়েই যাতায়াত করে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি কোনো সামরিক কৌশল বা ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে এই ক্যাবলগুলোতে আঘাত হানে, তবে তার অর্থনৈতিক ক্ষতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা আঘাত করবে ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে টোকিও পর্যন্ত।
তেহরানের কৌশল ও সাবমেরিন সক্ষমতা
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের নৌবাহিনীর কাছে এমন কিছু বিশেষায়িত সাবমেরিন এবং দূরনিয়ন্ত্রিত চালকবিহীন ডুবোযান (ROV) রয়েছে, যা সমুদ্রের তলদেশে গিয়ে নিখুঁতভাবে এই ধরনের ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল শনাক্ত করতে সক্ষম। যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ধরনের কোনো পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছে, তবে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কড়া নজর রাখছে এই রুটের ওপর।
আমেরিকান ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে ইরান ছায়াযুদ্ধ বা ‘গ্রে জোন’ (Grey Zone) স্ট্র্যাটেজির অংশ হিসেবে এই ডিজিটাল অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। কারণ, সমুদ্রের তলদেশে ক্যাবল কাটার মতো ঘটনা ঘটলে তা দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত নাশকতা, তা তাৎক্ষণিকভাবে প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন।
চরম ঝুঁকিতে বৈশ্বিক অর্থনীতি
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় টেলিকম ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ফার্মগুলোর মতে, হরমুজ প্রণালীর ক্যাবল নেটওয়ার্কের ওপর সামান্যতম বিপর্যয় ঘটলেও তা বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিদিন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি ডেকে আনবে। বিশেষ করে দুবাই, রিয়াদ এবং দোহার মতো মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান আর্থিক কেন্দ্রগুলো তাৎক্ষণিক ব্ল্যাকআউটের মুখোমুখি হতে পারে। একই সাথে ব্যাহত হবে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা (SWIFT) ও শেয়ার বাজারের কার্যক্রম।
আপাতত এই সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকাতে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর (Fifth Fleet) এবং তাদের মিত্র দেশগুলো পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী এলাকায় নৌ-টহল জোরদার করেছে। তবে সমুদ্রের শত শত ফুট গভীরে বিস্তৃত হাজার হাজার কিলোমিটার লম্বা এই ক্যাবল লাইনের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো সামরিক বাহিনীর জন্যই এক প্রকার অসম্ভব চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক মহলের আশঙ্কা, ইরান যদি এই ডিজিটাল নাটাই নিজের হাতে তুলে নেয়, তবে ভবিষ্যতের যুদ্ধ কেবল আকাশ বা ভূমিতে নয়, ছড়িয়ে পড়বে সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকার জগতেও।
সূত্র: সিএনএন